আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড: গণিতের গর্ব

আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) এ বছর বাংলাদেশের প্রথম রুপার পদকটি এল ধনঞ্জয় বিশ্বাসের হাত ধরে। অংশগ্রহণের আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সফলতা নিয়ে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড দল যেদিন (১৮ জুলাই) ঢাকা ফিরে এল, সেদিনটা ধনঞ্জয়ের জন্য হয়ে উঠল সোনায় সোহাগা। সেদিনই ফলাফল বেরোল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার। আর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ধনঞ্জয় এই পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫।

আর্জেন্টিনার মার ডেল প্লাটায় ৫৩তম আইএমওতে বাংলাদেশ আগের চেয়ে ভালো করবে, তা আঁচ করা গিয়েছিল আগেই। আর্জেন্টিনা থেকে পাঠানো উপদলনেতা মুনির হাসানের সংবাদেও সেই আভাস ছিল। চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেলও তা, বাংলাদেশের ঝুলিতে একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জপদক—সঙ্গে দুটি সম্মানসূচক স্বীকৃতি। ধনঞ্জয় বিশ্বাস পেয়েছে রুপা, নূর মোহাম্মদ শফিউল্লাহ ও সৌরভ দাশ পেয়েছে ব্রোঞ্জপদক। সম্মানসূচক স্বীকৃতি অর্জন করেছে মীর্জা মো. তানজীম শরীফ ও আদিব হাসান।

‘প্রথমে ভেবেছিলাম দীর্ঘ বিমানযাত্রা আমাদের কাবু করে দেবে। কিন্তু যতটা ক্লান্ত হব ভেবেছিলাম ততটা হইনি।’ এবারের গণিত অলিম্পিয়াডে পদক বিজয়ী তিনজনের সঙ্গে আলাপচারিতার শুরুতেই এ কথা বলল সৌরভ দাশ। নূর মোহাম্মদ শফিউল্লাহ যোগ করে, ‘আর্জেন্টিনা গিয়ে আমরা বিশ্রামই নিলাম। কেননা, আইএমওর প্রতিযোগিতার সময়টাতে কোনো প্রতিযোগীই আর গণিত অনুশীলন করে না। শরীর-মেজাজ ফুরফুরে রাখাটাই আসল। পরীক্ষার সময় ছাড়া, বাকি সময় কাটে বিশ্রাম আর নানা রকম খেলাধুলা করে।’

আগেই ওদের বলা হয়েছিল ভারী ভারী কোনো কথা হবে না, স্রেফ আড্ডা। তাই উদীয়মান তিন গণিতবিদও কথা বলল হালকা মেজাজে। ধনঞ্জয় বলে, ‘আর্জেন্টিনার ঠান্ডাটা আমরা বেশ এনজয় করেছি। শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায় আটলান্টিকে নেমেছি।’ সৌরভ জানায়, ‘মার ডেল প্লাটা শহরের পুরোটাই ছোট ছোট সমুদ্রসৈকত। আর সৈকতের দোকানগুলোতে জিনিসপত্রের যা দাম। একটা হ্যাট বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা!’

আইএমওর সময় বাংলাদেশ দলের গাইড মাউরো শিলম্যান খুব সহযোগিতা করেছেন—সে কথা জানাল শফিউল্লাহ। বলল, ‘মাউরো এর আগে আইএমওতে অংশ নিয়েছে। তাঁর কাছ থেকে আমরা কিছু স্প্যানিশ শব্দ শিখেছি। বিনিময়ে তাঁকে শিখিয়েছি কিছু বাংলা শব্দ।’

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশজুড়ে ১৭টি স্থানে অনুষ্ঠিত চলতি বছরের গণিত উৎসবে ২২ হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে বিভিন্ন ধাপে এই পাঁচজনকে বাছাই করে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে পাঠানো হয়েছিল। ধনঞ্জয়, সৌরভ ও শফিউল্লাহ তিনজনই একটা কথা বলল। সেটি হলো, এমন উৎসব করে পৃথিবীর কোনো দেশে আইএমওর জন্য দল গঠন করা হয় না। ‘তাই আমরা যখন ভিনদেশি প্রতিযোগীদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁরা বিস্মিত হয়েছেন। অনেকে বলেছেন, তাঁদের দেশে এমন উৎসবমুখর আয়োজন করা যায় কি না তা দেখবেন। অন্য দেশে শুধু পরীক্ষা হয়। সেটার ফলাফলের ভিত্তিতেই দল নির্বাচন হয়ে থাকে। তবে অনেক দেশেই রাষ্ট্রীয়ভাবে সহায়তা করা হয় আইএমওর দলকে।’

এবার নিজেদের সেরা সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ধনঞ্জয় মনে করে, ‘আমাদের আরও ভালো করা উচিত ছিল। সে সামর্থ্য আছে আমাদের।’ আইএমওতে সোনার পদক পাওয়ার জন্য বাড়তি কিছু উদ্যোগের প্রয়োজন আছে? সৌরভ দাশ বলে, যেভাবে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি আমাদের নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তা একেবারেই ঠিক আছে। সঠিক পথেই হাঁটছি আমরা।’ শফিউল্লাহ যোগ করে, ‘আমরা জ্যামিতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানে আছি। সংখ্যাতত্ত্বসহ অন্য বিষয়গুলোয় আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে।’

তিনজন আবার এক বিষয়ে একমত হলো, আমাদের যারা আইএমওতে অংশ নেয়, তাঁদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে অন্য বিষয়গুলোর চাপও নিতে হয়। অনেক দেশ আছে, যাদের প্রতিযোগীদের আর কিছুই পড়া লাগে না। এক-দুই বছর ধরে শুধু অঙ্কই করে। গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য প্রস্তুতি নেয়। তবে আমাদের প্রতিযোগীদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সারা বছর ধরেই অব্যাহত রাখতে হবে।

সৌরভ বলে, ‘আমাদের নবম-দশম শ্রেণীর গণিত পাঠ্যসূচি আইএমওর জন্য বেশ সহায়ক। বিশেষ করে জ্যামিতির এক্সট্রাগুলো।’

ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়ছে নূর মোহাম্মদ শফিউল্লাহ। গণিত আর জীববিজ্ঞান তার প্রিয় বিষয়। একই কলেজে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে সৌরভ দাশ। বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ তার। আর ধনঞ্জয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেবে এখন থেকে। যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা তার। তিনজনই গণিত উৎসব করতে এসে গণিতচর্চার প্রেমে পড়েছে। আর সে কারণেই তারা মেধার আন্তর্জাতিক আসরে নিজ দেশের পতাকা তুলে ধরতে পেরেছে। ‘লাল-সবুজ টি-শার্ট পরে পুরস্কারের মঞ্চে যখন উঠি তখন সত্যিই দেশের জন্য গর্বে আমাদের বুক ফুলে উঠেছিল।’