লিলি গড়ে তুলেছেন চারটি আর্থ-মানবিক প্রতিষ্ঠান

আর্তমানবতায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার গাংধোয়ারচর গ্রামের ফরমোজা মোমতাজ লিলি। পারিবারিক কারণে নিজে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে না পারলেও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন আর্তমানবতার সেবায়। নিজের একক প্রচেষ্টায় ৩৯ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন চারটি আর্থ-মানবিক প্রতিষ্ঠান। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে-

* গাংচিল প্রতিবন্ধী স্কুল
* ফরমোজা মোমতাজ মূকবধির বিদ্যালয়
* প্রবীণ বয়স্ক ও শিশু আশ্রয়কেন্দ্র
* সোহরাব হোছাইনীয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা।

ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি লিলি আপা। ওই সময় নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনারত অবস্থায় পারিবারিকভাবে একই গ্রামের সরকারি চাকরিজীবী মোমতাজ উদ্দিনের সাথে বিয়ে হয় লিলির। তাদের সংসারে রয়েছে তিন পুত্র সন্তান। বড় ছেলে ফখরুদ্দিন আল মাসুদ বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী। অপর দুই ছেলে ফরিদ উদ্দিন আল মামুন ও ফরহাদ উদ্দিন আল মাছুম গ্রামে মায়ের সাথে প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করছেন। তিন সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন তিনি।

জানা যায়, ২৬ বছর ঢাকায় কাটানোর পর ২০০৪ সালে গ্রামে ফিরে আসেন ফরমোজা মোমতাজ লিলি। গ্রামে এসে নিজেকে আর্তমানবতায় বিলিয়ে দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে গড়ে তোলেন চারটি প্রতিষ্ঠান। যার সমস্ত ব্যয় বহন করেন তিনি ও তার প্রবাসী ছেলে মাসুদ। তবে ক্রমান্বয়ে সরকারি, বেসরকারি ও সমাজের বিত্তশালীরা এগিয়ে আসছেন। অনুদান করছেন প্রতিষ্ঠানগুলোতে।

গাংচিল প্রতিবন্ধী স্কুল
তার প্রতিষ্ঠিত গাংচিল প্রতিবন্ধী স্কুলে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭৪ জন। প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা দেয়া হয় এখানে। রয়েছে একজন প্রধান শিক্ষকসহ মোট পাঁচজন শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক মাসিক দুই হাজার টাকা, সহকারী শিক্ষক এক হাজার টাকা এবং একজন করে আয়া, পিয়ন ও নৈশ্য প্রহরী আটশ টাকা বেতনে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। যা নিতান্তই কম। তারপরও শিক্ষকরা এখানে শিক্ষকতা করছেন। এখানে পার্শ্ববর্তী জেলার নান্দাইল, কিশোরগঞ্জসহ ৭৪ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। দূরবর্তী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে আবাসিক ব্যবস্থা। পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার পুরো খরচ বহন করে প্রতিষ্ঠান।

ফরমোজা মোমতাজ মূকবধির বিদ্যালয়
২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বধির শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এখানে ৮৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। এখানে পাকুন্দিয়া উপজেলাসহ আশপাশের অনেক বধির শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। যাবতীয় খরচ বহন করেন। রয়েছে আবাসিক ব্যবস্থা। ব্যয়ভার প্রতিষ্ঠান বহন করে।

প্রবীণ বয়স্ক ও শিশু আশ্রয়কেন্দ্র
অসহায় প্রবীণ ও অনাথ শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন প্রবীণ বয়স্ক ও শিশু আশ্রয় কেন্দ্র। বর্তমানে এখানে ছয়জন প্রবীণ ও তিনজন অনাথ শিশু রয়েছে। এর মধ্যে হোসেন্দি কুমারপুর গ্রামের আবদুল মান্নান এর স্ত্রী শামছুন নাহার (৮৫) নামে প্রবীণ বৃদ্ধা গত বছরের ১৩ মার্চ মারা যান। অনাথ তিন শিশু ছাড়াও বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দশম শ্রেণীর ছাত্রী ফারজানা আক্তার তার প্রতিষ্ঠানরই শিক্ষার্থী। ফারজানা আক্তার জিম-৯৭ এ বিজয়ী তিনজনের একজন। পাঁচ বছর বয়স থেকে তাকে লালন পালন করছেন এই লিলি আপা।

সোহরাব হোছাইনীয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা
একই সাথে প্রতিষ্ঠা করেন সোহরাব হোছাইনীয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা। এখানে রয়েছে ২৫ জন শিক্ষার্থী। যার মধ্যে ২১ জন শিক্ষার্থীই এতিম।

যেভাবে চলে প্রতিষ্ঠানগুলো
প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে সমাজের বিত্তশালী ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোনো সাহায্য সহযোগিতা না পেলেও বর্তমানে এগিয়ে আসছেন অনেকেই। সমাজসেবা অধিদপ্তর, জাতীয় প্রতিবন্ধী সংস্থা ও প্রবাসী অনেকেই এককালীন অনুদান প্রদান করেছেন বলে জানায় প্রতিষ্ঠাতা ফরমোজা মোমতাজ লিলি।
তিনি আরো জানান, প্রতিবছর সমাজসেবা অফিস থেকে ৫-১০ হাজার টাকা, রোটারি ক্লাব অব মতিঝিল মাসিক ৫ হাজার টাকা, ইনারহুইল ক্লাব অব মতিঝিল মাসিক ১ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করছে। পাশাপাশি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন কর্তৃক ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ২০ হাজার টাকা অনুদান বাবদ এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে ঋণ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা পেয়েছেন। সমাজের কয়েকজন বিত্তশালী এ মানবিক কাজে অনুদান প্রদান করলেও তা ৪টি প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই অপ্রতুল। বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তিদের অনুদানে ৭-৮ মাস যায়। বাকি মাসগুলো তাকেই সামলাতে হয়। তাই তনি বাংলাদেশের সকল বিত্তশালী ব্যক্তিদের এ মহতী কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।