দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে

সহজ পথে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আর এর প্রধান মাধ্যম হতে পারে বৈদেশিক কর্মসংস্থান। এটি বুঝতে অনেক দেরি হলেও অবশেষে বোধদয় ঘটেছে সরকারের। তাই অধিক অর্জন ও সরকারের প্রায় শূন্য বিনিয়োগের খাত জনশক্তিকে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে বর্তমানে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নারী কর্মীদের।

বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে হয় বাংলাদেশের মতো দেশকে। অথচ বর্তমানে দেশের জিডিপিতে বৈদেশিক সাহায্যের ৭ গুণেরও বেশি অবদান (১২ দশমিক ১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) এখন জনশক্তি খাতের। ২০১১ সালে প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স জিডিপিতে ১৩ শতাংশ অবদান রেখেছে। এতে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ বেশি থাকলে এ অর্জন হতো দ্বিগুণেরও বেশি। আর নারী কর্মীদের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক।

এসব কারণ বিবেচনা করে সরকার জনশক্তি খাতের নারী কর্মীদের বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই কর্মী সংগ্রহকারী ও সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে সফর করেছেন। তার নির্দেশেই শ্রমবাজার সম্প্রসারিত করতে উচ্চ পর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধি দল কুটনৈতিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও সম্পর্ক জোরদার করতে ঘুরেছেন বিভিন্ন দেশ।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেন এ খাতকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিদেশে নারী কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মাত্র ১০ হাজার টাকায় বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরবিহীন ঘটনা। সরকারি এ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগে। তবে এ বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন। আর এ কাজে গতিও খানিকটা কম বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রবাসী কর্মী পরিস্থিতি

সরকারি হিসেব অনুযায়ী বিশ্বের ১৪৩টি দেশে প্রায় ৮০ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। যদিও কর্মী সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। তবে এ কর্মীর মধ্যে খুব সামান্য অংশই নারী কর্মী। এসব কর্মীদের কাছ থেকে ২০১১ সালে ১২ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিটেন্স এসেছে। এই রেমিট্যান্স বৈদেশিক সাহায্যের ৭ গুণেরও বেশি।

প্রতিনিয়তই এর প্রবাহ বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই রেমিটেন্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগে প্রতি বছর রেমিটেন্স আসতো ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রবাসী কর্মীদের অর্থ পাঠাতে সরকারি উদ্যোগ

সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক খুলে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অভিবাসন ব্যয় মেটাতে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া ও দেশে সহজে রেমিটেন্স পাঠাতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এছাড়া বিদেশে ব্যাংকের শাখা খোলা, একচেঞ্জ হাউজ স্থাপন, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রেমিটেন্স পাঠানো, অবৈধ পথে রেমিটেন্স পাঠানোর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং এনজিওর মাধ্যমে প্রবাসী কর্মীর রেমিটেন্স পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে এখন তা পর্যাপ্ত হয়নি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থ পাঠাতে উৎসাহ দিতে প্রবাসীদের ‘সিআইপি’ ও ‘বিশেষ নাগরিক সুবিধা কার্ড’ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নারী কর্মীদের মূল্যায়ণ

জনশক্তি খাতের সবচেয়ে বেশি সঞ্চয় করেন প্রবাসী নারী কর্মীরা। তাদের সঞ্চয়ের বেশিরভাগ অর্থই দেশে আসে। আর তাদের এ অর্থ পরিবার ও দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অধিক বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করে। এ কারণে প্রবাসী নারী কর্মীদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

এ লক্ষ্যে মাত্র ১০ হাজার টাকায় বিদেশে নারী কর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। বিদেশে নারী কর্মীদের অভিবাসন নিরাপদ ও প্রবাসে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

বেশি পরিমাণ দক্ষ নারী কর্মী পাঠাতে হাউজকিপিং কাজে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জনে প্রশিক্ষিত করতে পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারিভাবে দেশে ১৪টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আওতায় ২১ দিনের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি সার্বিকভাবে নারী উন্নয়নে ইতিবাচক অবদান রাখবে বলেও মনে করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

মন্ত্রী জানান, ২০১১ সালে তিন হাজার ১০০ নারী কর্মী দিদেশে কর্মসংস্থান পেয়েছেন। দিন দিন নারী কর্মীর বিদেশে যাওয়া ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এর আগে যে নারী কর্মীরা বিদেশে গেছেন, তাদের পরিমাণ খুবই কম।

প্রতারণা ঠেকাতে ব্যবস্থা

দেশে প্রতারণা ঠেকাতে ও প্রবাসে সম্মানের সঙ্গে কর্মী হিসেবে কাজ করতে প্রত্যেক নারী কর্মীকে ফিঙ্গার প্রিন্ট ও অন্যন্য তথ্যসহ স্মার্ট কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা থাকছে বৈধভাবে বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে। স্মার্ট কার্ডে কর্মীর ছবিসহ নিয়োগ কর্তা ও প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজেন্সির তথ্যাদি রাখার ব্যবস্থাও থাকছে। এছাড়া স্মার্ট কার্ডটি বিমানবন্দরে স্থাপন করা কার্ড রিডারের সাহায্যে পরীক্ষা করে ফ্লাইট নম্বর এবং তারিখ দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিমান আরোহনপত্র প্রিন্ট হয়ে আসবে।

অনলাইনে তথ্য যাচাই

মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, বাহারাইন ও সিঙ্গাপুরের ভিসা অনলাইনে যাচাই করার ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। এর ফলে এসব দেশে জাল ভিসায় বিদেশ গমন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে অনলাইনে ভিসা যাচাইয়ের সুবিধা দিতেও প্রচেষ্টা চলছে। বিদেশগামী যে কোনো কর্মী যে কোনো জায়গা থেকে অনলাইনে অথবা বিএমইটি থেকে ভিসা যাচাই করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের যে কোনো ব্যক্তি ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রের সাহায্য নিতে পারবেন।

কর্মী প্রশিক্ষণ

আরো ৩০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও পাঁচটি মেরিন টেকনোলজি ইনস্টিটিউট নির্মাণের কাজ চলছে। প্রতিটি জেলায়ই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে এ পর্যন্ত দুই শিফটে ৬০ হাজার প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই বিদেশে কর্মসংস্থান পেয়েছেন। নির্মাণাধীন ৩৫টি কেন্দ্র বাস্তায়িত হলে আগামী ২০১৩-২০১৪ সাল থেকে বছরে লক্ষাধিক কর্মী প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন।

অভিবাসন দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল

আন্তর্জাতিক চাহিদার ভিত্তিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, শ্রম বাজার অনুসন্ধান, জরিপ, গবেষণা, প্রচার ইত্যাদি কার্যক্রমের জন্য ১৪০ কোটি টাকা ‘সিড মানি’ দিয়ে অভিবাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। ওই তহবিলের মুনাফা থেকে নারী কর্মীদের বিনা খরচে কিপিং ট্রেড ও কেয়ার গিভার ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কিছু প্রকল্পও নেওয়া হচ্ছে।

প্রত্যেক জেলা প্রশাসক দফতরের কল্যাণ ডেস্কে ব্যবহারের জন্য ৩২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক দফতরের মাধ্যমে কম্পিউটার কিনে বিএমইটি থেকে সফটওয়ার নিয়ে কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।

এতে বিদেশ গমনকারী কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয়ভাবে ডাটাবেজ আকারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ডাটা ব্যাংক থেকে সরাসরি কর্মী নিয়োগের সুবিধা দেওয়া ও দালালদের প্রতারণা রোধে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে কম্পিউটার ডাটাবেজ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে। বিদেশে গমনেচ্ছু কর্মীদের রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম জেলা প্রশাসকের দফতরে সম্প্রসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে প্রচলিত শ্রমবাজারের বাইরে নতুন নতুন শ্রমবাজারের অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এ তৎপরতার অংশ হিসেবে পোল্যান্ড, সুইডেন, রাশিয়া, সুদান, গ্রীস, কঙ্গো, এসতোনিয়া, আলজেরিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, দক্ষিণ আফ্রিকা, এ্যাঙ্গোলা, বোতসোয়ানা ও সিয়েরালিওনে কর্মী প্রেরণ শুরু করা হয়েছে।

জবাবদিহিতা

অভিবাসন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ভিজিলেন্স টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

তৃণমূল পর্যায়ে নিবিড় তত্ত্বাবধান

বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্পর্কিত বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রদানের মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও জেলা প্রশাসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাসিক সমন্বয় সভা, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করতেও পারামর্শ দেওয়া হয়।

সরকারের সেবা কার্যক্রম

বিভিন্ন দেশ থেকে সরকারি খরচে কর্মীর মৃতদেহ দেশে ফেরত আনা, দাফন-কাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকা প্রদান, অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিবার প্রতি দুই লাখ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আটকা পড়া ও অসুস্থ কর্মীদের দেশে ফেরতের জন্যও কল্যাণ তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

সেবার আওতা সম্প্রসারণ

প্রবাসী কল্যাণে ১৬টি শ্রম উইংয়ের অতিরিক্ত আরো ২৩টি শ্রম উইং সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন এসব শ্রম উইং শুরু হলে প্রবাসীদের সেবা ও কল্যাণের আওতা সম্প্রসারিত হবে।

সরকারিভাবে কর্মী প্রেরণ

মালয়েশিয়ায় কর্মরত ২ লাখ ৬৭ হাজার কর্মীকে বৈধ করা ছাড়াও নতুন করে কর্মী পাঠাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আরো পাঁচ হাজার কর্মী পাঠাতে চুক্তি করা হবে শিগগিরই। সরকার টু সরকার কর্মী পাঠাতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী জানান, আগামী বছর নতুন আরো ৭ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগে নারী কর্মীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। পূরুষের পাশপাশি নারী কর্মীদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বাড়লে দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যাবে বলে মনে করেন তিনি।