লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায়

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। অর্থনীতিতে অনেক খারাপ খবরের মধ্যে এটিকে সুখবর বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯৩ হাজার ৬১২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ২৪২ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে এবং প্রবৃদ্ধির হার ১৭ শতাংশ। টাকার অস্বাভাবিক দরপতন, ভর্তুকির চাপ, বৈদেশিক সাহায্য সংকটসহ নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গত অর্থবছর অতিবাহিত হলেও একমাত্র স্বস্তি ছিল রাজস্ব আদায়ের সন্তোষজনক পারফরম্যান্স। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক দিক। আগামীতে এ প্রবণতা ধরে রাখতে হবে। তা না হলে অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অবশ্যই আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো খবর। তবে এ কথা সত্যি যে, এখন অর্থনীতির যে অবস্থা তাতে নতুন অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে; কারণ হিসেবে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে করের ভিত্তি ব্যাপক বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির হারও বেশি ধরা হয়েছে। অধিক রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি ও আদায় প্রক্রিয়ায় নিবিড় তদারকির পরামর্শ দেন তিনি। জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে রাজস্ব আয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, জিডিপি বাড়লে রাজস্ব আয়ও বাড়বে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশজ আয় ১ শতাংশ হারে বাড়লে রাজস্ব আয় কমপক্ষে ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়া উচিত। এর নিচে রাজস্ব আয় হলে তখন সামষ্টিক অর্থনীতিতে ঝুঁকি বাড়ে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো খুবই জরুরি বলে মনে করেন তারা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো হয়েছে। অর্থনীতিতে এ সফলতা আগামীতেও ধরে রাখতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতায় আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ২২ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৭ শতাংশ। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি পর্যায়ে আগের চেয়ে ৩৯৪ কোটি টাকা বেড়ে আদায় হয়েছে ৩১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে বড় খাত মূল্য সংযোজন কর বাবদ আদায় হয়েছে ৩৪ হাজার ১৫ কোটি টাকা। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। মূলত গ্যাস, মোবাইল ও সিগারেট খাত থেকে বেশি আদায় হওয়ায় মূসক খাতে বেশি সাফল্য এসেছে।বিদায়ী অর্থবছরে প্রত্যক্ষ বা আয়কর খাতে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গেল বছরে আয়কর খাতে প্রায় ২৭ শতাংশ হারে কর আদায় বেড়েছে। আদায় হয়েছে ২৮ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। সব মিলে ৯৩ হাজার ৬১২ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ হয়েছে। এনবিআর সূত্র বলেছে, এটি সাময়িক হিসাব। চূড়ান্ত হিসাবে আরও বাড়তে পারে। পর পর দুই অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এনবিআর। তবে বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় এর আগের ২০১০-১১ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছিল। ওই বছরে আাদয় হয় মোট ৭৯ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৮ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি অর্জনের ওই হার ছিল এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগের অর্থবছর ২০০৯-১০ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৬২ হাজার ৪২ কোটি টাকা। আর প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১১ শতাংশ।