এ এক অন্য লড়াই নীলফামারীর ১৬০০ প্রতিবন্ধীর!

প্রচলিত শব্দে প্রতিবন্ধী মানেই পরিবারের বোঝা, এক ঘরে করে রাখা, সাহায্য-সহযোগিতা আর করুণা নিয়েই বেঁচে থাকা। সমাজের মানুষের সঙ্গে মনের ভাব প্রকাশ করা যেন তাদের এক স্বপ্ন। 

কিন্তু এসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা নীলফামারী সদরের পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের ১ হাজার ৬শ প্রতিবন্ধীর জীবন। করুণা কিংবা অন্যের দ্বারস্থ নয়, নিজ উদ্যোগে সংগঠিত হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। গত ৩ বছর ধরে সুঁই-সুতার কাজ করে নিজেদের পরিবর্তনের লড়াই করছেন তারা। 

পঞ্চপুকুরের মিস্ত্রিপাড়া গ্রামের ৩শ সংগ্রামী প্রতিবন্ধীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গঠিত হয়েছে ডেভেলপম্যান্ট অর্গানাইজেশন ফর অপটিমাম রিহেবিলিটেশন (ডোর) সমিতি। বাজারের খালি জায়গা ভাড়া নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে সমিতির ঘর। 

ভোরের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘরে একত্রিত হন তারা। গল্প-আড্ডা শেষে মাটিতে চট বিছিয়ে শুরু হয় তাদের কর্মযজ্ঞ। কাজের পরিধি এক-একজনের এক-এক রকম। কেউ সুঁই-সুতা, কেউ সেলাই মেশিনে, কেউবা আবার কাপড় কাটা নিয়ে ব্যস্ত। এক মিনিটের জন্য সময় নেই কারও। 

নিজেদের পুঁজি দিয়ে শহর থেকে কাপড় কিনে তৈরি করেন নানান পোশাক। সেই পোশাক বাজারে বিক্রি করে চলছে তাদের সংসার। সেলাই প্রশিক্ষণেও অন্যের দ্বারস্থ নন তারা। তাদের প্রশিক্ষক হিসেবে রয়েছেন প্রতিবন্ধী রজিফা বেগম।

আত্মপ্রত্যয়ী প্রতিবন্ধীদের এ খবর ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। খবর শুনে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের আরও ১ হাজার ৩শ প্রতিবন্ধী ছুটে আসেন সমিতির সদস্য হওয়ার জন্য। এখন সমিতিতে মোট সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৬শ। বাক, শারীরিকসহ প্রায় সব ধরনের প্রতিবন্ধীই রয়েছেন এ লড়াইয়ে।  

সমিতির সভাপতি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রাশেদুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, প্রতিবন্ধীরাও সমাজের আট-দশজন মানুষের মতোই রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। কিন্তু প্রকৃতির খেয়ালে তারা আজ প্রতিবন্ধী। শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে সমাজ ও পরিবার থেকে তারা বিতাড়িত হন। সবাই তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন। করুণা আর দয়া ছাড়া কোনো সহযোগিতাই পান না তারা। 

তবে এসব থেকে মুক্তি পেতে সংগ্রামে নেমেছেন তারা। এ এক অন্য সংগ্রাম, বাঁচার সংগ্রাম। দয়া ছাড়াই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে সবাই আজ সংগঠিত।  

পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের প্রতিবন্ধীদের এ বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ অনেকেই ছুটে এসেছেন তাদের পাশে। ইতোমধ্যে, উত্তরাশশী গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক নাসির উদ্দিন শাহ ফকীর ৩ শতক জমি প্রতিবন্ধীদের সমিতির নামে দান করেছেন।

শুধু শিক্ষক নাসির উদ্দিন নন, এলাকার পল্লী চিকিৎসক মাহফুজার রহমান সহমর্মিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন তাদের পাশে। বিনাপয়সায় তাদের স্বাস্থ্য সেবাসহ সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন তিনি। এছাড়াও জেলা শহরের কয়েকজন গুণী মানুষও তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বলে জানান তারা।

ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রতিবন্ধীদের প্রশংসা করে বাংলানিউজকে বলেন, “তারা সামাজিকভাবে শুধু বেঁচে থাকা নয়, উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছেন। আমিও তাদের পাশে আছি!”