সবুজ অর্থনীতি ॥ এক নতুন দ্বার উন্মোচন

বিশ্বে সবুজ অর্থনীতির গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা বেড়েই চলছে। বিশ্বের অস্তিত্বের কথা চিন্তা করেই এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা, গ্রহণ করা হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। তাছাড়া এর রয়েছে বাণিজ্যিক নানা দিকও। চলতি ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচীর এক সভায় বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয় ‘সবুজ অর্থনীতি : আপনি অন্তর্ভুক্ত তো?’ ১৯৯২ সালের জুন মাসে রিও ডি জেনিরোতে মানব পরিবেশ সংক্রান্ত ধরিত্রী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সম্মেলনে গৃহীত হয়েছিল এজেন্ডা ২১, যাতে ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সমাজের বিভিন্ন অংশের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা এবং এজেন্ডাসমূহ বাস্তবায়নের প্রায়োগিক বিষয়াবলী, এবং এতে সমর্থন দিয়েছিল ১৮০টি দেশ। এর দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর ফের ধরিত্রী শীর্ষ সম্মেলনের ২০তম বার্ষিকী অনুষ্ঠিত হল ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে। গত ২০ বছরে পৃথিবী বদলে গেছে অনেক। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক এ্যান্ড এ্যাটমোসফেরিক এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য তাপমাত্রাজনিত দূষণ বেড়েছে ১০ শতাংশ। ১৯৯২ সালে এর পরিমাণ ছিল ৩৫৮ পিপিএম। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩৯৪ পিপিএম। গত ২০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতির শিকার হয়েছে ৪৪০ কোটি মানুষ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য দুই ট্রিলিয়ন ডলার (১৬৪ লাখ কোটি টাকা)। এই সময়ের বন উজাড় হয়েছে ৭৪ কোটি একর, যার আয়তন ২০টি বাংলাদেশের সমান। এ রকম প্রেক্ষাপটে শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হলো ২১-২২ জুন। এবারের সম্মেলনে দুটি থিম গুরুত্ব পায়। প্রথমটি হলো, দারিদ্র্যবিমোচন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সবুজ অর্থনীতি এবং দ্বিতীয়টি টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। 
ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে বিশ্বের খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙ্গে পড়ছে, যার জন্য দায়ী মানুষের অসচেতনতামূলক নানা কর্মকা- বলে মনে করেন সবুজ অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা। ক্রমেই পাল্টে যাচ্ছে পাহাড়, অরণ্য, নদী ইত্যাদির পরিবেশ। এর ফলে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে এসবের সঙ্গে জড়িতদের জীবিকার নানা দিকও। নদীর পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় বিশ্বে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর ঘাটতি বেড়েই চলেছে। তার মানে বিশ্বে আমিষের ঘাটতিও বাড়ছে। জানা গেছে, অনেক প্রজাতির মাছ এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। বিলুপ্ত হয়েছে বহু প্রজাতি। বিলুপ্ত হওয়ার প্রহর গুনছে আরও প্রজাতি। ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানে ভূমিকম্প ও সৃষ্ট সুনামির কারণে কয়েকটি পরমাণু কেন্দ্রের (জাপানের) ব্যাপক ক্ষতি হয়। এর তেজস্ক্রিয় ছড়িয়ে পড়ে জাপানসহ আরও অনেক দেশে। এর তেজস্ক্রিয়ার প্রভাবে অনেক স্থানের পানি জলজ প্রাণী বসবাসের প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন মৎস্যজীবীরা ও প্রাণিবিজ্ঞানীরা। 
পৃথিবীর উত্তাপ বেড়ে যাওয়ায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে মেরু অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত বরফের রাজ্যেও। যার ফলে গলে যাচ্ছে একের পর এক হিমবাহ। বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। মিষ্টি বা মিঠা পানির আঁধার হচ্ছে সঙ্কুচিত। পানি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এমন দিন হয়ত আসবে যখন মিঠা পানি আর পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন স্থানের মিঠা পানি লবণাক্ত পানিতে পরিণত হচ্ছে বিশ্বের পানি ও মাটিতে স্যালাইনিটির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে বলে। তাছাড়া নানাভাবে দূষণের শিকার হচ্ছে মিঠা পানি। তাতে মারাত্মক সমস্যায় পড়ে গেছে পানি নির্ভর অর্থনীতি। এর প্রভাবে সমস্যা দেখা দিয়েছে ফসল উৎপাদনেও। এশিয়ায় অনেক স্থানে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক বিষের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে। মানুষের শরীর-স্বাস্থ্যের জন্যও তা মারাত্মক ক্ষতিকর। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সবুজ অর্থনীতি বা গ্রীন ইকোনমি এমন এক ধরনের অর্থনীতি, যার মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব পরিবেশগত ঝুঁকি ও বাস্তুতান্ত্রিক অভাব বা সমস্যা, যা প্রতিষ্ঠা করে মানবকল্যাণ ও সামাজিক সমতা। ২০০৭ সালের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মন্দাভাব দেখা দিয়েছিল, তা গত শতকের ত্রিশের দশকের মন্দার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা এখন পর্যন্ত বসবাস করছি অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে। তবে ২০০৯ সালের দিকে মন্দা (বৈশ্বিক) অনেকাংশে কমে গেলেও নানা পিছুটানের কারণে কাক্সিক্ষত মাত্রায় বা লক্ষ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মানুষের মৃত্যু, রোগ-ব্যাধি, পরিবেশ দূষণ, সামাজিক বৈষম্য ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞরা তাই সবুজ অর্থনীতির দিকে ঝুঁকেছে যা আরও বেশি শক্তিশালী করবে উন্নয়নকে। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কর্মসূচী বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতের জন্য সবুজ অর্থনীতির বিস্তৃত কর্মকৌশল সুপারিশ করে ২০০৮ সালের দিকে। 
সবুজ অর্থনীতির অন্যতম বা বিশেষ দিক হল বাতাসে কার্বন বা গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে আনা। উদাহরণ দিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমাদের এমন ধরনের গাড়ি তৈরি করা উচিত, যা চলতে পারবে জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়াই। সোলার সেল, সাশ্রয়ী ব্যাটারি, জৈব জ্বালানি প্রভৃতি দূষণমুক্ত প্রযুক্তি বা উপায় উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাড়ি চালানো হলে তা সহায়ক হবে সবুজ অর্থনীতির জন্য। সবুজ অর্থনীতির মোদ্দাকথা হলো প্রাকৃতিক সম্পদকে পণ্য হিসেবে দেখা যেগুলো পরিবেশের ক্ষতি করবে না কিন্তু অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখবে।
পুনর্প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি হলো সবুজ অর্থনীতির অপর গুরুত্বপূর্ণ দিক। পুনর্প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজন উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা । রিসাইক্লিং এমন এক ধরনের সিস্টেম, যার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বস্তু বা বর্জ্যকে নতুন পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। আজকাল উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোতে এ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ প্রযুক্তি এসেছে উন্নত দেশগুলোর থেকে। এটি সবুজ অর্থনীতিরই একটি দিক।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, সৌরশক্তি, ভূতাপীয় শক্তি, অপ্রচলিত শক্তি প্রভৃতির ব্যবহার করতে হবে যথাযথভাবে, যা সবুজ অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবুজ অর্থনীতি মোটেই নিশ্চিত হবে না যদি বন উজাড়, জলাশয় ভরাট প্রভৃতি কর্মকা- না থামানো যায়। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেন, অর্থনীতি আর পরিবেশের সুরক্ষা মোটেই বিপরীত নয়, বরং একটা আরেকটার পরিপূরক। এ দুটোর মাধ্যমেই বিশ্বে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটতে পারে। তাছাড়া সবুজ অর্থনীতি হলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলার হাতিয়ারস্বরূপ। 
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচী এ বছর বিশ্বপরিবেশ দিবসের মূল বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে সবুজ অর্থনীতি বা গ্রীন ইকোনমিকে। এর সঙ্গে জড়িতরা বলেন, সবুজ অর্থনীতি মানে সম্পদের যথোপযুক্ত ব্যবহার। মুরগির বিষ্ঠা, মনুষ্য মলমূত্র ইত্যাদিও ফেলনা নয়। এসব জিনিস দিয়ে তৈরি করা যায় গ্রীন এনার্জি । অর্থাৎ এ থেকে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করা যায়। এসব দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন করলে কয়লা, তেল, গ্যাস ইত্যাদি সম্পদের ওপর চাপ কমবে। তাছাড়া এসব সম্পদের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে বিশ্বে। মজার ব্যাপার হলো, পোল্ট্রি আবর্জনা থেকে বিদ্যুত উৎপাদন করলে তা থেকে বাই প্রোডাক্ট হিসেবে পাওয়া যায় উন্নতমানের সার, যা জমিতে প্রয়োগ করলে প্রচুর ফসল উৎপাদন হতে পারে। 
কিন্তু সবুজ অর্থনীতির নাম করে পরিবেশ নিয়ে বাণিজ্যিকীকরণ করছে কয়েকটি ধনী দেশ, যা মোটেই কাম্য হতে পারে না। সত্যিকার অর্থেই অনেক দেশের পক্ষে সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়ন যেমন কঠিন তেমন জটিল। তবে এর বাস্তবায়ন সম্ভব। এক্ষেত্রে ধনী ও উন্নত দেশগুলোকে শর্তহীনভাবে এগিয়ে আসতে হবে প্রযুক্তি আর অর্থ নিয়ে। তবে পরিতাপের বিষয় এই যে, এখন পুঁজিবাদের প্রবক্তারা নতুন করে সবুজ অর্থনীতির ব্যবস্থাপত্র তৈরি নিয়ে মহাব্যস্ত, যার মাধ্যমে তারা পরিবেশ উন্নয়নের নাম করে মুনাফা লাভের চেষ্টায়রত। সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেছেন, এক সময় সবুজ অর্থনীতি আঘাত হানবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কৃষির ওপর। তাতে বারোটা বাজবে কৃষি ও কৃষকের। স্থানীয় ও প্রান্তিক চাষীদের অধিকার হরণ করা হবে জৈব জ্বালানি, ইথানল, জিএমও প্রকল্প ইত্যাদির মাধ্যমে। তাতে দারিদ্র্য হবে আরও তীব্র। আসল বিষয় হলো, এমনও দেশ আছে, যে দেশ এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি সবুজ অর্থনীতির বিষয়টি। ওইসব দেশের মানুষ মনে করে, দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যে কোন ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা হওয়া জরুরী। কেননা, কিছু দেশের মাটি, পানি ইত্যাদি শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এসব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার প্রয়োজন। আর সবকিছুর মূলে রয়েছে জনসংখ্যার যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ। পরিবর্তন ঘটাতে হবে উন্নত দেশগুলোর ভোগ কাঠামোর। এসব ছাড়া সবুজ অর্থনীতি হবে শুধুই কথার কথা। বাংলাদেশ পরিবেশগতভাবে পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ তাই সবুজ অর্থনীতির বিষয়টিকে বাংলাদেশের গ্রহণ করা উচিত অর্থনৈতিকে গুরুত্ব দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কার্যকারিতাকে মাথায় রেখে।

july 1