চলতি বছর দারিদ্র্য কমে দাঁড়াবে ২৬.৪%

চলতি ২০১২ সালে দেশের দারিদ্র্য কমে দাঁড়াবে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশে, যা বর্তমানে রয়েছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) গত তিন বছরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে অগ্রগতি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৮ শতাংশ। ২০১০ সালে এসে তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রতিবছর দারিদ্র্য কমছে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ হারে, এ হিসেবে দারিদ্র্য হারের অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্য কমিয়ে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। 
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (জিইডি) ড. শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, ২০০৫ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের অবস্থা পর্যক্ষেণ করে দারিদ্র্য হ্রাসের এ লক্ষ্যের কথা বলা হচ্ছে। তবে প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে তার চেয়ে দারিদ্র্যের হার আরও বেশি কমবে। কেননা বর্তমানে জিডিপি বেড়েছে। সাধারণ বিষয় হচ্ছে জিডিপি যদি ১ শতাংশ বাড়ে তাহলে দারিদ্র্য দশমিক ৮৯ শতাংশ হারে কমে। এ বিবেচনায়ও দেশের দারিদ্র্য কমবে এটি নিশ্চিত বলা যায়। 
সূত্র জানায়, বতর্মান সরকারের গত তিন অর্থবছরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে অর্জন বিষয়ক প্রতিবেদনটি সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান কয়েকটি ইস্যু যেমন- মোট দেশজ আয়, প্রবৃদ্ধি, রফতানি আয়, কর্মসংস্থান, রেমিটেন্স, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি এবং সামাজিক খাতের দারিদ্র্য নিরসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বহুমাত্রিক এবং এ বিবেচনায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য একাধিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যদিও অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির একটি ধনাত্বক সম্পর্ক বিদ্যমান এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এ প্রেক্ষিতে এ সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মন্দা বর্তমান মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ। এইএমএফ-এর সার্বিক পণ্য সূচক ২০১০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি প্রধানত ২০১০ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে প্রকট হলেও সম্প্রতি উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা জ্বালানি তেলের মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামঞ্জস্যপূর্ণ মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলে মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান হার নামিয়ে আনা সম্ভব। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক হতে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের নিচে নেমে এসেছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। 
মোট দেশজ আয় ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জিডিপি ছিল ৮৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরে ছিল ৭৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ জিডিপি বেড়েছে, বৃদ্ধির এ হার ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সরকারের দ্বিতীয় বছরে ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রথমবারের মতো ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছরে মোট দেশজ (জিডিপি) আয় ছিল ১১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাব (এপ্রিল) অনুযায়ী ২০১১-১২ অর্থবছরে জিডিপি প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ১১১.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, যা আশা করা যায় বছর শেষে উন্নীত হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ২০১২-১৩ অর্থবছরে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ১২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জিইডি মনে করে দ্বিতীয় দফা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং আর্ন্তজাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির সত্ত্বেও বাংলাদেশ অন্যান্য বিকাশমান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির সঙ্গে তালমিলিয়ে তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০১৩ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৃষি খাতে বর্তমান সন্তোষজনক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে, উৎপাদশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এবং সর্বোপরি বিদ্যুত, জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে পরিকল্পিত অধিকতর বিনিয়োগ করা গেলে ২০১২-১৩ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 
প্রতিবেদনে রফতানি আয়, বৈদেশিক কর্মস্থান, রেমিটেন্স আয়, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিন বছরের অনেক অর্জন হয়েছে এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।