বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাড়ছে বিদেশি শিক্ষার্থী

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে দেখা মিলছে বিদেশ থেকে আসা এসব শিক্ষার্থীর। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এটি শিক্ষা মানের একটি ইতিবাচক দিক।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অন্যান্য দেশের তুলনায় কম খরচ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কম হওয়ার কারণেই বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে ঝুঁকছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১০-এর তথ্য অনুসারে বছরটিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯শ ১৬ জন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫শ ৮৯, ২০০৮ সালে ছিল ১ হাজার ৩৩, ২০০৭ সালে ৮শ ৩, ২০০৬ সালে ৬শ ৬৯ জন। ২০০৫ সালে ৯শ ৩৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে অধ্যয়নরত ছিল।

২০১০ সালে বাংলাদেশে অধ্যয়নরত বিদেশির মধ্যে ১ হাজার ৫শ ৫৭ জনই ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩শ ৫৯ জন। আগের বছরের তুলনায় বছরটিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছিল ৩০ ভাগ।

২০০৯ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১শ ৯৯ জন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ছিল ৩শ ৯০ জন।

২০০৮ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিদেশিদের সংখ্যা ছিল ৮শ ১২ জন। একই সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল ২শ ২১ জন বিদেশি শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম, তুলনামূলক কম শিক্ষা খরচ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সহজতর ভর্তি প্রক্রিয়ার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশমুখী হচ্ছে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণের কারণেই বিদেশিরা এখানে পড়তে আসছে বলে তার অভিমত। অধ্যাপক চৌধুরী জানিয়েছেন, এই ইতিবাচক দিকটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে বিশ্বের ৩০টি দেশের শিক্ষার্থীদের পদচারণা রয়েছে এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল সব দেশের শিক্ষার্থীরাই প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়।

উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে অবস্থান করছে সে দেশগুলো হলো কানাডা, চীন, জর্ডান, অস্ট্রেলিয়া, মালি, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, ফিলিস্তিন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, ইরান, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, উগান্ডা, জাম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, লাইবেরিয়া, ব্রিটেন, ভিয়েতনাম, জাপান এবং মালয়েশিয়া।

মঞ্জুরি কমিশনের তথ্য ঘেঁটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনটিতে কত সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী ২০১০ সালে অধ্যয়নরত ছিল তা না জানা গেলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরতদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। তালিকা অনুযায়ী, ২০১০ সালে ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭টিতেই ছিল বিদেশি শিক্ষার্থীদের আনাগোনা।

সর্বাধিক সংখ্যক ১ হাজার ১শ ৬৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চট্টগ্রামে। বছরটিতে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল ১শ ৩০ জন, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ৫৬ জন, গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ৩২ জন এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজিতে ৩১ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত ছিল।

এছাড়াও নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, ডেফোডিল ইন্টারশনাল ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সিটি ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি, অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্স এবং অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত ছিল বিদেশি শিক্ষার্থীরা।

বিদেশি ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসায় বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে বলেই মতামত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের।

অনেকের অভিমত, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাড়াতে পারলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক হতে পারে। কারণ দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবছরই ব্যাপক সংখ্যায় আসন ফাঁকা থাকছে। আসন থাকা সত্তে¡ও আর্থিক সমস্যার কারণে অনেক শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। এই শূন্য আসনগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা গেলে তা অর্থনীতির জন্য লাভজনক বলেই বিবেচিত হবে। দেশে বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ।

একটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০১০ সালে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসন সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ১শ ৭৯টি। এর বিপরীতে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল ৮৭ হাজার ৭শ ৬২ জন। অর্থাৎ মোট আসন সংখ্যার অর্ধেকই ফাঁকা থাকছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ফাঁকা আসনগুলো বিদেশি শিক্ষার্থীর মাধ্যমে পূরণ করা গেলে তা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে বলেই সবার অভিমত।