গড়ে তুলতে চাই সম্ভাবনার দেশ

মানুষের পরিচয় তার যোগ্যতায় ও মনুষ্যত্ববোধে। মানবসন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেই মানুষের যোগ্যতা বা মনুষ্যত্ব সর্বগুণে বিকশিত হয় না। এসব গুণাবলি নিজের সাধনায় অর্জন করতে হয়। আর তা যথার্থভাবে অর্জন করা সম্ভব হলে তার মধ্যে যোগ্যতার বিকাশ ঘটে, মনুষ্যত্ব অর্জিত হয় এবং তখন একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে তার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রস্ফুটিত হয়। এ যোগ্যতা বা গুণাবলি অর্জনের জন্য মানুষকে যা অর্জন করতে হয় তা হল শিক্ষা। শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ তার জীবনের প্রয়োজনীয় বিকাশ ঘটায়। যে যোগ্যতার অধিকারী হয়ে জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং মনুষ্যত্বের গুণাবলি অর্জন করে সে সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে নিজের গৌরব ঘোষণা করে। ব্যক্তিজীবনে শিক্ষার এ সাফল্য জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হয়ে জাতিকে সমৃদ্ধ করে, বিশ্বের দরবারে অর্জন করে মর্যাদাসম্পন্ন আসন। এসব কারণেই বলা হয়ে থাকে_ ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদ-।’ মেরুদ- ছাড়া কোনো মানুষ যেমন বাঁচতে পারে না বা চলতে পারে না, ঠিক তদ্রূপ শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি কল্পনা করা যায় না। মেরুদ- যেমন মানুষের অন্যতম প্রধান অঙ্গ তেমনি শিক্ষাও জাতির একটি প্রধান অংশ।
ব্যক্তিজীবনে শিক্ষার প্রভাব গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ নানাদিক থেকে যোগ্যতা অর্জন করে। এর মাধ্যমে মানুষ নিজের গুণের যেমন বিকাশ ঘটায় তেমনি বিভিন্ন বিদ্যা অধ্যয়ন করে নানা বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে। তার এ যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে সে জীবনে প্রভূত উন্নতির সুযোগ পায়। সেজন্য মানুষ সারাজীবন শিক্ষালাভ করে। শিক্ষার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। শিক্ষার মাধ্যমে বুদ্ধি ও মেধার বিকাশ ঘটে। যার শিক্ষা নেই তার বুদ্ধি বিকশিত হয় না। তার কাজের যোগ্যতা থাকে না। জাতিকে শিক্ষিত ও সমৃদ্ধ করতে হলে বিভিন্ন পেশার লোকের কাজের মাধ্যমে সুফল অর্জন করতে হয়। কিন্তু যার মধ্যে কোনো শিক্ষা নেই বা অশিক্ষিত তারা অন্যের বোঝা হয়ে থাকে। তখন জাতির উন্নয়নের সফল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
জাতির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষার। বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে মানবজাতি উন্নতির পথ প্রসারিত করে। অন্যদিকে শিক্ষার অভাবে একটি জাতি নির্জীব হয়ে যায়। শিক্ষাহীন জাতি কোনো উন্নয়ন কর্মকা-ে জড়িত হতে পারে না। ফলে দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়। জাতীয় জীবনে শিক্ষার গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে শিক্ষাকে জাতির মেরুদ- বলে অভিহিত করা হয়েছে। শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে একটি জাতির প্রতিটি লোক যদি জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করে যোগ্যতার অধিকারী হয় তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা প্রচুর অবদান রাখতে পারবে। কাজে-কর্মে সব ক্ষেত্রে তখন জাতি উন্নতি লাভ করবে এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধি আনয়ন করে সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি জাতিকে মর্যাদাসম্পন্ন করে তোলে এবং জাতীয় জীবনে সুখ নিয়ে আসে।

একটি জাতির উন্নতির জন্য যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তার জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষ জনশক্তির। কারিগরি শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা, প্রযুক্তিবিদ্যা, বাণিজ্যিক শিক্ষা, মানবিক শিক্ষা ইত্যাদি নানাভাবে মানবসম্পদ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। জাতীয় জীবনে মানবসম্পদের প্রাচুর্য সৃষ্টি হলে সমৃদ্ধ ও গৌরবান্বিত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।


মানবিক শিক্ষায় ‘সমাজকল্যাণ’ বিষয়টি অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে অধ্যয়ন শেষে এ দেশের তরুণরা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত হতে পারে, যার মাধ্যমে দেশের সুফল বয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে এ দেশে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেশের গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যবিমোচনে সহায়তা করে আসছে। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েও দেশের জন্য কল্যাণকর বা মঙ্গলজনক কিছু করা সম্ভব, যা মানবিকতা থেকে আসে।
বর্তমানে আমাদের দেশের পল্লী উন্নয়নে সরকারি প্রক্রিয়া এবং কৌশলের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। বর্তমান বিশ্বে বেসরকারি সংস্থা একটি ব্যাপক পরিচিত ধারণা। সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়ন শেষে এ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিওগুলোতে যোগদান করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গ্রামীণ জীবনের উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে এসব প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে থাকে।


একটি সুন্দর, সুশীল সমাজ গড়তে এ ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণকারী এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সাহায্য করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো বহু কর্মতালিকা প্রদান করে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে_
জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা প্রদান, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, গণশিক্ষা কার্যক্রম, গ্রামীণ মহিলাদের উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, শিশু কল্যাণ, গ্রামীণ সংগঠন তৈরি, আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভূমিহীনদের সহায়তা, কৃষি ও গৃহঋণ প্রদান, গ্রামীণ কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও ঋণসংক্রান্ত সহায়তা, গৃহায়ন ও নির্মাণ কাজ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, শক্তিহীনদের সহায়তা, শিক্ষামূলক কর্মকা-, ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, সামাজিক বনায়ন, নদী ও জলবায়ু সংরক্ষণ, পরিবেশ দূষণরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি।
এ দেশটিকে সুন্দর ও সুপরিকল্পনামাফিক পরিচালনার জন্য ‘সমাজবিজ্ঞান’ বিষয়ে অধ্যয়ন করে সুষ্ঠু মেধা ও কর্মনিষ্ঠ মনোবল নিয়ে বহু তরুণ-তরুণী আজকাল বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানে যোগদান করে নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলছে।


সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এ দেশ বাংলাদেশ। অনেক সুন্দর এ চিরসবুজ বাংলাদেশ। কিন্তু বর্তমানে আমাদের এই সুন্দর দেশটি বিভিন্ন সমস্যার ভারে জর্জরিত। নানাবিধ সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যাটির নাম হচ্ছে ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধি’। ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ক্ষুদ্র এ দেশটিতে আশঙ্কাজনক হারে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৮০ লাখ। এ অধিক জনসংখ্যা দেশটির জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে নানা উন্নয়নমূলক কর্মকা-। তাই জনগণকে এসব ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ বা মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। এজন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা- গ্রহণ করতে হবে। মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে মানবসম্পদ উন্নয়ন তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে। একটি দেশের উন্নয়ন অনেকটা নির্ভর করে সে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সুষ্ঠু ব্যবহারের ওপর। মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার অবদান অপরিসীম।
সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা দেশের উন্নয়নে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে। কেননা এ দেশের গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত। তাই তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলে আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর দেশ ও শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে পারি। এটি আমাদের অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব।
নেপোলিয়ান যথার্থই বলেছেন_
‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও
আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’
সুতরাং আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি সর্বজনীন শিক্ষা বা গণশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বস্তরের লোকদের শিক্ষিত করে তোলার মধ্যদিয়ে একটি শিক্ষিত জাতি গঠন করা সম্ভব। নিজ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। বিদেশি সংস্কৃতিতে অন্ধ হয়ে পড়লে চলবে না। নিজ সাহিত্য ও সংস্কৃতি, জাতীয় চেতনা আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ সম্পদ বিলুপ্ত হতে দেওয়া যাবে না। এ অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণ করে আমরা আমাদের দেশটিকে আরো সুন্দর করে গড়ে তুলব। গড়ে তুলব নতুন সম্ভাবনাময় একটি বাংলাদেশ।

 



অনামিকা খান
৩য় বর্ষ
সমাজকল্যাণ
ইডেন মহিলা কলেজ

NewImage