আমরাই গড়ব বাংলাদেশ

মানুষ জন্মগ্রহণ করেই প্রকৃত মানুষ হয় না। মানুষের সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য চাই শিক্ষা। ব্যক্তিগত উন্নতি, সামাজিক উন্নতি কিংবা জাতীয় উন্নতি যেকোনো উন্নতির জন্য চাই শিক্ষা। বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো এ সম্পর্কে বলেন- ঊফঁপধঃরড়হ ৎধঃরড়হধষরহমবং ধ সধহ্থং ংড়ঁষ, যবধৎঃ ধহফ সরহফ, ঊৎঁফরঃরড়হ নধংরপধষষু ভষড়ঁৎরংযবং ঃযব ংঢ়রহব ড়ভ ধহু ঢ়বড়ঢ়ষব.
গণিত শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। মানব সমাজের বিকাশের ইতিহাসের মতোই গণিতের ইতিহাসেরও একটি গতিশীল ও অভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে। এ সত্যটা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর প-িতবর্গ একবাক্যে মানতে সম্মত হন। গণিতশাস্ত্রের সব শাখাতেই পারদর্শী যেসব মহারথী ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- পিথাগোরাস, আর্কিমিডিস, আলখোয়ারিজমি, অ্যারিস্টর্কাস, হিপাভার্স, মেনেলাস, টলেমি, নেপিয়ারের মতো ব্যক্তিত্ব।
গণিতশাস্ত্রের সব শাখাতেই পারদর্শী যেসব মহারথী ছিলেন তাদের মধ্যে গউসকেই সর্বশেষ গণিতজ্ঞ বলা যায়। ১৭৯২ সালে (পনের বছর বয়সে) গউস-এর ল্যাটিন ভাষায় বেশ দখল হয়ে গিয়েছিল; আর অঙ্কশাস্ত্রের মোটামুটি জ্ঞান হয়েছিল। তিনি ব্রান্সউইকের ক্যারেলিন কলেজ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন, তারপর ডিউকের ইডায় আঠার বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই থেকে অয়লার, লাম্রাঞ্জ ও নিউটনের সমুদয় পুস্তক এত সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করেন যে, তার প্রফেসররাও স্বীকার করলেন যে গউস তাদের সমকক্ষ হয়ে গেছেন। গউস অঙ্কশাস্ত্রের চর্চা করে ‘সংখ্যাতত্ত্ব’_ এ কতগুলো সূত্র আবিষ্কার করে ফেললেন। জ্যোতিষ্কসংক্রান্ত বিষয়ে গউস বহুসংখ্যক আবিষ্কার ও হিসাব করেন। জীবনের অধিকাংশ সময়েই তিনি জ্যোতিঃবিদ্যায় নিয়োজিত থেকে ব্যবহারিক জ্যোতিষ্ক বিজ্ঞানের অনেক উন্নতিসাধন করে গেছেন; তবু তিনি বিদ্যুৎ ও চুম্বক সম্বন্ধেও বৈজ্ঞানিক গবেষণা দ্বারা অক্ষয় কীর্তি অর্জন করেছেন। তার জ্যোতিষবিদ্যা ও বিজ্ঞানশাস্ত্রের চর্চার ফাঁকে ফাঁকে তিনি বিশুদ্ধ গণিতের প্রায় প্রত্যেক শাখায় গবেষণা করে নতুন নতুন অবদান রেখে গেছেন। ‘কাল্পনিক সংখ্যাকে’ জড়িত সংখ্যা আখ্যা দিয়ে তিনি যেসব মৌলিক সম্পদ রেখে গেছেন তাও উলি্লখিত হয়েছে। সংখ্যা স্কেলের বিছিন্ন সংখ্যা বিষয়ক তথ্যাদি ছাড়াও নিউটন ও লাইবনিজ যেসব বর্ধিষ্ণু বিবর্ধমান সংখ্যার গুণাগুণ বিচার করে নতুন ক্যালকুলাস সৃষ্টি করেছিলেন সেদিক দিয়েও লাগ্রাঞ্জ ও লাপ্লাসের সঙ্গে তিনি আধুনিক গাণিতিক বিশ্লেষণের ভিত্তি নির্মাণকারক হিসেবে বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বহু সহস্র গাণিতজ্ঞ এক একটি ক্ষুদ্র শাখা অবলম্বন করে বিশুদ্ধ বা ফলিত গণিতের পাতায় পাতায় বিচরণ করেছেন ও করছেন বললেও অত্যুক্তি হয় না। তারা যে শুধু বিভিন্ন শাখায় অভাবনীয় উন্নতিই করেছেন তা নয়, তারা ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীর অগ্রপথিকদের সৃষ্ট গাণিতিক অস্ত্রশস্ত্রগুলোকে ঘষে-মেজে তীক্ষ্ন ও শানিত করে ফেলেছেন। অ্যারিস্টটল অঙ্কশাস্ত্রের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন_ ‘গণিত হচ্ছে পরিমাণ সম্পর্কিত বিজ্ঞান।’ আজকার দিনের গণিতজ্ঞরা আর এ সংজ্ঞা গ্রহণ করতে রাজি নন। ১৯০৩ সালে বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘যুক্তিনীতির ওপর যুক্তিনীতি প্রয়োগ করে যেসব সিদ্ধান্ত করা যায়, তারই নাম বিশুদ্ধ গণিত।’ আর একসময় তিনি বর্তমান বিশুদ্ধ গণিতের বস্তু নিরপেক্ষ ভিত্তির ওপর বিশেষ ঝেঁকে লক্ষ করে বলেছিলেন- ‘গণিত এমন একটি বিদ্যা যাতে কি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাও জানা চাই, আবার যা বলা হচ্ছে তাও সত্য কিনা তার ঠিক নাই।’ বিংশ শতাব্দীর সভ্যতা সৃষ্টিতে গণিত এক বিশিষ্ট অংশগ্রহণ করেছে, আর একে বজায় রাখবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা চালাচ্ছে। তা ছাড়া মানুষের ইতিহাসে গণিতের অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার পর্যায় লক্ষ রেখে সাধারণ মানুষও দেখতে পারে যে চার-পাঁচ শতাব্দী ধরে গ্রিক সভ্যতার স্বর্ণযুগ বর্তমান ছিল, সেই সময়েই তাদের গণিত বিদ্যারও সর্বাধিক উন্নতি হয়। তারপর ইউরোপীয় রেনেসাঁর আবিষ্কার হওয়ার পরও পাঁচ শতাব্দী ধরে বিপুল উৎসাহে চিন্তা চর্চা চলেছিল। পক্ষান্তরে আর্কিমিডিসের মৃত্যুর পর থেকেই অন্ধকার যুগ ও মধ্যযুগের স্থিতিশীল অবস্থায় গণিতেরও স্থিতিশীল ঘুরপাক খাওয়ার বিষয় লক্ষণীয়। বাণিজ্যিক ক্রয়-বিক্রয়ের খসড়া দেখে যেমন দেশের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি মানুষের গাণিতিক অগ্রগতির তালিকাও তার মনন-শক্তি ও জীবনশক্তির পরিচয় বহন করে।
কেমন সহজে আটপৌরে চিন্তা থেকে ধীরে ধীরে গণিতের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে। আর গণিতের বিভিন্ন শাখার মধ্যে পারস্পরিক সংস্রব থাকাতে কেমন করে এক বিষয়ের উৎকর্ষ অন্য বিষয়ে ঘটিয়ে শেষোক্ত বিষয়েরও উন্নতি সাধিত হয়েছে। এসব কথা ইতিহাসের মারফত সাধারণের কাছে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি।
গণিতবিদ্যা যে শুভবিজ্ঞানের ঐশ্বর্য-ভা-ার এবং আনুষঙ্গিক সম্পদ ও ক্ষমতার চাবিকাঠি মাত্র তা নয়, এর সাহায্যে আমাদের রহস্যজনক বিশ্ব সম্বন্ধেও পূর্ণতর জ্ঞান লাভ হয়, আর এর চেয়ে বড় কথা এর চর্চা দ্বারা চিন্তাশীল নরনারী মাত্রই এমন একটা মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। যার বর্ণনায় ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছেন : 
‘ …….ঃযধঃ যড়ষফ ধপয়ঁধরহঃধহপব রিঃয ঃযব ংঃধৎং ধহফ বিফফবফ ংড়ঁষ ঃড় ংড়ঁষ রহ ঢ়ঁৎবংঃ নড়হফ ড়ভ ৎবধংড়হ, ঁহফরংঃঁৎনবফ নু ংঢ়ধপব ড়ৎ ঃরসব্থ – গণিত শাস্ত্রের বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা ও রহস্য উদ্ঘাটনের প্রচেষ্টায় মানুষ সুদৃঢ় নক্ষত্রের সঙ্গেও আত্মীয়তা পাতায় এবং নির্মল যুক্তির বন্ধনে আত্মার সঙ্গে আত্মার মিলন ঘটানো, আর সে মিলনে দেশ-কালের ভেদ নাই।’ আগামীদিনে যেন গণিত আরো নতুন নতুন আবিষ্কারের কারণ হয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। আগামীতে আমি শিক্ষিকা হতে চাই যেন নিজের জাতিকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারি।
গণিত ইতিহাস পর্যালোচনা দ্বারা এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের এবং সনাতনের সঙ্গে অধুনাতনের চিন্তাধারার সংযোগ, সমন্বয় ও পরিপুষ্টিত লক্ষ করে বিশ্ববাসী সবার পরস্পর নির্ভরশীলতা আর একই বিরাট লক্ষ্য অভিমুখে অগ্রগতি সমন্ধে ধারণা কিছুটা স্পষ্ট হলে হয়তো সামগ্রিক জীবনযাপনের মধ্যে ঔদার্য ও মাধুর্যের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব নয়।

দীপ্তি দাস

৪র্থ বর্ষ

গণিত বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ

NewImage