পর্যটনশিল্প ঘিরে সম্ভাবনার অপার দিগন্ত

পর্যটন শিল্প কোনো দেশের উন্নতির অন্যতম শক্তিশালী একটি মাধ্যম। একটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এ খাতটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্বে অনেক উন্নয়নশীল দেশ রয়েছে যাদের উন্নয়নের মূল উৎস হচ্ছে পর্যটন শিল্প। এদেশগুলো পর্যটকদের কাছে স্বর্গভূমির মতো। এসব দেশ প্রতি বছর পর্যটন শিল্প থেকে কোটি কোটি ডলার আয় করছে এবং স্বনির্ভর জাতি হিসেবে আজ তারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। উদাহরণ হিসেবে এশিয়ার তিনটি দেশ_ দুবাই, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এ দেশগুলো পর্যটকদের কাছে অনেক বেশি পছন্দনীয়। দুবাইতে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক ভ্রমণে আসেন। ২০১১ সালের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সে বছর দুবাইতে বেড়াতে এসেছিলেন প্রায় ১৮ লাখ পর্যটক। এছাড়া প্রতি বছর শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণে আসেন। বাংলাদেশেও পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এই খাতটি এখন পর্যন্ত অবহেলিত। ফলে এদেশে পর্যটন শিল্প শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। নদ-নদী-পাহাড়-বন-সমুদ্র বিধৌত বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার ভূমি। আমাদের দেশে রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত, রয়েছে সেন্টমার্টিনের মতো প্রবাল দ্বীপ, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন আর পাহাড়-বন-ঝরনাঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এছাড়াও আমাদের দেশে ভূ-প্রকৃতি ও জনজাতির বৈচিত্র্যে পূর্ণ। বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি নিয়ে এদেশের প্রায় ৪৫টি জন-জাতি পারস্পরিক সহাবস্থান করছে। এসব কিছু একজন পর্যটককে মুগ্ধ করতে বাধ্য। কিন্তু সে তুলনায় বাংলাদেশে পর্যটন করতে আসা মানুষের সংখ্যা নগণ্য। কারণ হতে পারে_ এ স্থানগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার তেমন কোনো সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এখানে অনুপস্থিত। হতে পারে স্থানগুলো বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ উপযোগী অবকাঠামো করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কারণ এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও পরিকল্পনা চোখে পড়ে না। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের দিকে তাকালেই দেখা যাবে এ মনোমুগ্ধকর পর্যটন স্থানের কী বেহাল দশা। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের যোগাযোগের রাস্তা এখনো ভাঙাচোরা। আর সুন্দর, সাজানো-গোছানো কক্সবাজার গড়ে তোলার বদলে এখানে অপরিকল্পিতভাবে হোটেল, মোটেল, গেস্ট হাউস বা হাউজিং গড়ে তোলা হয়েছে। আবার এগুলোর মানও বিশ্বমানের নয়। এ তো হল একদিক। সৈকতের অবস্থা তো আরো অব্যবস্থাপনায় ভরা। সৈকতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে, যারা পর্যটকদের সঙ্গে নিয়মিত প্রতারণা করে। এছাড়াও সন্ধ্যার পর সমুদ্র সৈকত পর্যটকদের জন্য অনেক সময়ই বিপদজ্জনক হয়ে ওঠে। ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে। এসব অনিয়মের কারণে সমুদ্র সৈকত পর্যটকদের জন্য তেমন নিরাপদ নয়। এর ফলে তারা এখানে ভ্রমণে আসতে নিরাপদ বোধ করেন না। ফলে ধীরে ধীরে পর্যটকরা বাংলাদেশে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এ মুহূর্তে সরকারের উচিত পর্যটন শিল্পের দিকে গুরুত্ব দেওয়া। এতে করে প্র্রতি বছর অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।


স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও আজ আমাদের দেশের অবস্থা যা তা দেখে অন্য যেকোনো দেশের মানুষের কাছে মনে হতে পারে_ এটা কি আসলেই একটি স্বাধীন দেশ? আমাদের এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের দুর্নীতি, অনিয়ম আসলেই চোখে পড়ার মতো। সরকারের ওপর মহল থেকে একেবারে নিচ পর্যন্ত সর্বত্রই চলে দুর্নীতি, অনিয়ম। একটি দেশের উন্নতির অগ্রযাত্রায় এ বিষয়গুলো আজ অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্রের আজকের যে অবস্থা তা সত্যিকার অর্থে কারো কাছে কী প্রত্যাশিত? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হওয়ার কথা ছিল জনগণের বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানভিত্তিক, একমুখী। তবে তা হয়নি। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মূলত ব্রিটিশ আমলের লর্ড মেকলের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার উত্তরাধিকার। এখানে নানামুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। রয়েছে ধনীদের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম_ যেখানে মূলত টাকা দিয়েই শিক্ষা ক্রয় করা হয়। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য রয়েছে বাংলা মাধ্যম। আর নিম্নবিত্তদের জন্য হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষা। এগুলো সবই ব্রিটিশ আমলের বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থার উত্তরাধিকার। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর_ আজ এই সময়ে এসে বাস্তবায়ন হয়নি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাব্যবস্থা ও জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। আমাদের বিচার ব্যবস্থার দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে সেখানেও ব্রিটিশ আমলের আইন ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার নিজস্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা থাকার দরকার। তার তেমন কিছুই আজ এই রাষ্ট্রে উপস্থিত নেই। এ জন্য আমাদের দেশ আজ পিছিয়ে পড়েছে। সরকারের এখনই উচিত বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রের নিজস্ব জনগণের গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা। এছাড়া চালু করা উচিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, উচিত দেশের বিচার বিভাগে নিজস্ব আইন তৈরি করা। এতে করে আমাদের দেশে আগামীতে আরো উন্নতি হবে এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া ত্রিশ লাখ শহীদের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।


ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণই নতুন। আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় খুব উপযোগী একটি বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই বিষয়টির বাজার চাহিদা ব্যাপক। এরইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন দেশে এই ডিগ্রিধারী লোকের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে নামিদামি বিভিন্ন হোটেল রয়েছে, যা পরিচালনার জন্য মূলত এই বিষয়টির গুরুত্ব ব্যাপক। এর জন্যই মূলত এই ডিগ্রিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ পর্যটন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে তার সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বড় বড় সব নামিদামি বিলাসবহুল হোটেল। এগুলো পরিচালনার জন্য ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষিত পেশাদারি মানুষ প্রয়োজন। শুধু বাইরের দেশ নয়, বাংলাদেশেও অনেক নামিদামি তারকা বিশিষ্ট হোটেল রয়েছে। এগুলো পরিচালনা করার জন্যও ব্যাপক সংখ্যক জনবল প্রয়োজন। মূলত এখানে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ডিগ্রিধারীর অগ্রাধিকার স্বাভাবিকভাবেই বেশি। এতে করে আমাদের দেশে সময় উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি হবে। তারা দেশের চাহিদা পূরণ করে বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের নাম উজ্জ্বল করবে। বাজার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল। বাঙালি জাতির শত শত বছরের মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিপীড়ন-বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন তা বাস্তবায়নে আমাদের বিষয়টি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে পাস করা তরুণরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা রাখি। এক্ষেত্রে প্রয়োজন পর্যটন শিল্পকে ঘিরে সরকারের যুগোপযোগী নীতিমালা ও বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। আর সেটা হলেই আমাদের মতো স্বপ্নবান অনেক তরুণ দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারবে।