নীল চাষ এখন আশীর্বাদ!

ব্রিটিশ আমলে এ দেশে নীল চাষ বলতেই ছিল আতঙ্ক। ইংরেজদের জুলুমে বাধ্য হয়ে ফসলের জমিতে নীল চাষ করতেন কৃষকরা। আর ভারতজুড়ে চাষীদের বিদ্রোহের মুখে সেই নীলকর সাহেবরা লেজ গুটিয়েছিল প্রায় দেড়শ’ বছর আগে। এরপর ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে গেছে খোদ ব্রিটিশ শাসকরাই। ধুলার নিচে চলে গেছে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার। আবার ফিরে এসেছে সেই নীল চাষ। রংপুর অঞ্চলের জমিতে নীল গাছ লক লক করে উঠেছে। কিন্তু এবার আর এই চাষের পেছনে হাত নেই নীলকরদের। মঙ্গাপীড়িত উত্তরবঙ্গে এবার আশীর্বাদ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে নীল চাষ। বছর চারেক আগে শুরু হওয়া নীল চাষ নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে গরিব কৃষকদের। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ রংপুরে এবার ১৩৫ হেক্টর জমিতে নীল চাষ হয়েছে। জানা গেছে, দুনিয়াজুড়ে নীলের মূল চাহিদাটা বেড়ে গেছে। রংপুরের চাষীরা এবার স্বপ্ন দেখছেন, তারাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন। সে অনুযায়ী রংপুরের সদর উপজেলা, পাগলাপীর, কিশোরগঞ্জ ও জলঢাকার ব্যাপক এলাকায় কৃষকরা ব্যাপকভাবে নীলচাষ শুরু করে। সরেজমিনে জানা গেছে, নীল উত্পাদনে সরাসরি জড়িত পরিবারের সংখ্যা একশ বিশের ওপর! আর পাতা উত্পাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষকের সংখ্যা কয়েক হাজার। রংপুরে বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় দেড় হাজার কেজি প্রাকৃতিক নীল উত্পাদিত হচ্ছে; যা দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণের পর বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে আবার ফিরে আসা নীল চাষ এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার যুবক নিখিল রায়, হতদরিদ্র মঞ্জু রানী, বিমলা বা বুলু মিয়ার মতো লোকদের। এসব মানুষই আগে জুলাই-আগস্টে আসন্ন মঙ্গার প্রস্তুতি নিত। আর সেই সময় এখন তারা ব্যস্ত নিজেদের নীল উত্পাদন কেন্দ্র চালানোর কাজে। নিজে সফলতার মুখ দেখার পর তাদের কারখানায় কাজ করে স্থানীয় অনেক দুস্থ পরিবার খুঁজে পেয়েছে জীবিকার পথ। সরেজমিনে দেখা গেছে, জমির মালিকরা খুশি, চাষী খুশি, খুশি সবাই। খুশি নিজেদের তৈরি রং দিয়ে কাপড় রাঙানোয় যারা ব্যস্ত তারাও। রঙিন সেই কাপড় চলে যাচ্ছে গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর ও রংপুরসহ দেশের বাইরেও। ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস! যে নীল একদিন তাদের পেটের ভাত কেড়ে নিয়েছিল, আজ সেই নীল ফিরে এসেছে মঙ্গা তাড়িয়ে দিতে। কৃষকরা জানান, পাতাগুলো ১২ ঘণ্টা ড্রামের পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পানির রং হালকা সবুজ হলে তা আরেকটি ড্রামে ঢালা হয়। ৩০ মিনিট ধরে ঝাঁকুনি দেয়ার পর ড্রামের পানিতে প্রচুর ফেনা হয়। ফেনাসহ পানির ড্রাম থেকে নল বা বালতির সাহায্যে পাতলা কাপড় বিছানো বাঁশের ঝুড়িতে ঢালা হয়। ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যে পানি কাপড় ভেদ করে বের হয়ে যায়। তখন কাপড়ের ওপর এক ধরনের তরল তলানি পড়ে। চামচের সাহায্যে তলানি সংগ্রহ করে তা রোদে শুকানো হয়। দুই-তিন দিন রোদে শুকালে এটি কঠিন হয়ে যায়। এই কঠিন জিনিসটি পিষে নীল তৈরি করা হয়। নীলের সঙ্গে হরীতকীর গুঁড়া মেশালে তা সোনালি রং ধারণ করে। কলার মোচা পিষে মেশালে নীলে কালচে আভা পড়ে। প্রতিবছর জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এ রং তৈরি করা হয়। গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেন, উন্নতমানের সবুজ সার পাওয়া যায় বলে এ অঞ্চলের অনেক কৃষক এখন নীল চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। নীল চাষ ও উত্পাদন করে এ এলাকার অনেক পরিবার এখন স্বাবলম্বী হয়েছে।