অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে: বিভিন্ন সূচকের অগ্রগতিতে বিশ্বব্যাংকের সন্তোষ

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৩%। যেখানে উন্নত দেশগুলোতে হবে ৫.৫%। দক্ষিণ এশিয়ায় গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৫%।ৃ:: মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে এক অঙ্কের ঘরে এসেছে।
:: রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি ভালো। রেমিটেন্সে ইতিবাচক প্রবাহ।
:: তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা রয়েছে।
কাগজ প্রতিবেদক : বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রধান সূচকে সন্তোষ প্রকাশ করে দাতাসংস্থা বিশ্বব্যাংক আশা প্রকাশ করেছে, সূচকগুলোর আরো উন্নতি হবে। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের হতাশা কাটেনি।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) অর্জিত হবে। উন্নত দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধির গড় হার হবে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে তা এক অঙ্কের ঘরে (১০ শতাংশের নিচে) নেমে এসেছে। আগামীতে তা আরো কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি বেশ ভালো। রেমিটেন্স প্রবাহ ইতিবাচক। পুঁজিবাজারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।
তবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থবিরতা কাটেনি। জ্বালানি তেল আমদানি বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে ভর্তুকি বেড়েছে।
গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির হালচাল’ শীর্ষক এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এ কথা বলা হয়।
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লিখিত বক্তব্য দেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধান অর্থনীতিবিদ সঞ্জয় কাঠুরিয়া ও দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক পরিচালক আরনেস্টো মে। সভার শুরুতে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি অ্যালেন গোল্ডস্টেইন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।
জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আস্থা ফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওরস (এসএন্ডপি) বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রয়েছে। আমাদের বিবেচনাতেও তেমনটিই মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এটাকে অবশ্যই ভালো প্রবৃদ্ধি বলতে হবে। শিল্প ও সেবা খাতের ভালো প্রবৃদ্ধির কারণেই এটা অর্জিত হবে।
গত ১১ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক বলেছিল চলতি অর্থবছর বাংলাদেশে ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বরাবরই বলে আসছেন ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। আর চলতি অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়েছে। এটাকে আমরা সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করি।
আমরা জানি মুদ্রানীতির প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি আরো কমবে বলে আমরা আশা করছি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় পর মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে।
মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণগ্রহণের পরিমাণ কমানোর পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে জাহিদ বলেন, বেশ কিছুদিন শেয়ারবাজার ছিল অস্থির। এখন বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। এর ফলে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনাÑ এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মার্চ মাসের হিসাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এ হার যথেষ্ট বলে আমরা মনে করি। এখানে একটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত
হচ্ছে জ্বালানি ও অবকাঠামো। এগুলোর সমাধান না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। এগুলো নিয়ে সবাই ‘ভাঙা রেকর্ড’ বাজিয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এখনো ইতিবাচক। তবে নিট পোশাক রপ্তানি কমে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। অন্য দিকে রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আছে। কোনো কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দিলে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি জ্বালানি তেলে। তেলের দাম বেড়ে গেলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।
আগামী বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া উচিত কিনাÑ এ প্রশ্নের উত্তরে জাহিদ বলেন, বাজেটে এমন কোনো সুযোগ দেয়া ঠিক হবে না, যাতে কালো টাকা উৎপন্ন হতে উৎসাহিত করে।
সঞ্জয় কাঠুরিয়া বলেন, রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয়। ৯ মাসের হিসাবে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ শতাংশ। যদিও গত বছর এ সময়ে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। তারপরও এই ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক।
তিনি বলেন, চলতি রেমিটেন্স প্রবাহে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হবে। এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির লেনদেনের ভারসাম্য ঠিক রাখতে যথেষ্ট অবদান রাখছে।
৯টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া ঠিক হয়নি মন্তব্য করে সঞ্জয় বলেন, এমনিতেই কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট আছে। নতুন ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম শুরু হলে এ সংকট আরো বাড়বে।
মতবিনিময়ের শুরুতে অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ৫০ কোটি ডলার অর্থ ছাড় হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি। অনেকেই বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড় হচ্ছে না বলে উদ্বিগ্ন। কিন্তু এটা মোটেই ঠিক না। আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি এবং যাবো।