প্রাক-বাজেট আলোচনা-২০১২ : কৃষি ও গ্রামীণ খাতের উন্নয়ন

NewImage

 ড. জাহাঙ্গীর আলম
রূপকল্প ২০২১ তথা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২১ এর মূল কথা হলো গতিশীল ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে একটি মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৩ সালে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে এবং ২০১৭ সালে এই হার ১০ শতাংশে উন্নীত করে ২০২১ সাল পর্যন্ত তা ধরে রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫) প্রণীত হয়েছে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। এ পরিকল্পনার মেয়াদে বছরে গড়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ার কথা ৭.৩ শতাংশ। শেষ দুটি বছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার দেখানো হয়েছে ৮ শতাংশ। বর্তমান মহাজোট সরকারের প্রথম দুই বছর অর্থাৎ ২০০৯-১০ এবং ২০১০-১১ সালে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে যথাক্রমে ৬.১ এবং ৬.৭ শতাংশ হারে। ২০১১-১২ সালে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হলো ৭ শতাংশ। দেশের বর্তমান উন্নয়নের গতি ও প্রকৃতি দেখে ইতোমধ্যেই কিছুটা হতাশা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেকে ধারণা করছেন, চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, এবার প্রবৃদ্ধি হবে ৬.২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ধারণা করছে, শেষপর্যন্ত ৫.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি হ্রাস, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সংকট, বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস এবং রাজনৈতিক সমস্যা প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য আমাদের অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। কিন্তু অর্থনীতির নিয়ামকগুলো অধিকাংশই যেখানে নেতিবাচক ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে সেখানে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা খুবই দুরূহ হবে। সংখ্যাতত্ত্বের মারপ্যাঁচে তা অর্জিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হলেও সাধারণ মানুষের মনে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। তবে আবহাওয়া ভালো থাকার কারণে এ বছর কৃষির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ায় জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাতে সর্বোচ ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হতে পারে।
চলমান বৈশ্বিক মন্দা, তারল্য সংকট, বিনিয়োগ হ্রাস, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও উচ্চমাত্রায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে এবার বিশ্বেও গড় প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৪.৫ শতাংশ। এশিয়ায় গড় প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কালিত হয়েছে ৭.৭ শতাংশ, চীনে ৯.২ শতাংশ এবং ভারতের ৮.৮ শতাংশ। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশকে একটি মাঝারিগোছের প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। আর উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সক্ষমতা অর্জন করতে হলে আমাদেরকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তাই আগামী ২০১২-১৩ সালে ৭.৫ শতাংশ এবং ২০১৪-১৫ সালে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে যুক্তিযুক্ত। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অবশ্য বৈশ্বিক মন্দা কেটে গেলে এবং আমাদের মূল্যস্ফীতি অবদমিত হয়ে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে ২০১৫-১৬ সাল থেকে যথাক্রমে ৯ ও ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা সমীচীন হবে।
কৃষি ও গ্রামীণ খাতের অগ্রাধিকার
আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বর্তমান নাজুক প্রেক্ষাপটে আমাদের বহির্বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যেই অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে বিদেশি ঋণ ও অনুদান। ঘন ঘন লোডশেডিং, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তারল্য সংকটের কারণে নির্মাণ ও শিল্প খাতের অবস্থাও ভালো যাচ্ছে না। শেয়ার মার্কেট ধসের কারণে ছোট বিনিয়োগকারীরা সেখানে আর কোন আস্থা খুঁজে পাচ্ছেন না। এমন এক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের একটি নির্ভরযোগ্য খাত হচ্ছে চিরায়ত কৃষি ও গ্রামীণ খাত। খাদ্যে সয়ম্ভরতা অর্জন, পরনির্ভরতা হ্রাস, কর্মসৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য এ খাতের ওপরই সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে অন্তত আরও এক দশক পর্যন্ত। রূপকল্প ২০২১ অনুসারে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের নীতিমালা গ্রহণের ও বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এ খাতটিকেই।
কৃষি ও গ্রামীণ খাতের বরাদ্দ
আমাদের বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো উন্নয়ন বাজেট। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৪ সালে শতকরা ৩৪ ভাগ অর্থ খরচ করা হয়েছিল কৃষি ও পল্লীউন্নয়ন খাতে। এরপর ক্রমেই তা হ্রাস পেয়ে ২০১১-১২ সালের সংশোধিত বাজেটে এসে দাঁড়িয়েছে ১৭.৯৫ শতাংশে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকারের বরাদ্দ হলো ১২.৬৬ শতাংশ অর্থ, যার সঙ্গে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের পরোক্ষ সম্পর্ক থাকলেও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ কম। এটাকে বাদ দিয়ে হিসাব করলে কৃষির মূল খাত এবং সমবায় ও পল্লীউন্নয়ন মিলে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা দাঁড়ায় মাত্র ৫.২৯ শতাংশ। কৃষি ও গ্রামীণ খাতের উন্নয়ন ব্যয়ের এই ক্রম হ্রাসের সঙ্গে জিডিপিতে কৃষি খাতের শরিকানা ক্রম হ্রাসের একটা সরাসরি সম্পর্ক রয়ে গেছে। এ সময়ের ব্যবধানে মোট জাতীয় আয়ে কৃষির শরিকানা স্থির মূল্যে ৪৯.৭৬ শতাংশ থেকে কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯.৩০ শতাংশে। অবশ্য একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে জাতীয় আয়ে কৃষির শরিকানা কমে যাওয়ার সঙ্গে শিল্পের শরিকানা আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে তা ঘটেনি। তৈরি পোশাক শিল্পে সাম্প্রতিককালে যে আয় হচ্ছে তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে বিদেশি কাপড় আমদানির খরচ মেটাতে। বাণিজ্য খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হলেও এর সঙ্গে জড়িত আছে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং। সেবা খাতে অর্জিত প্রবৃদ্ধি বেশ উঁচু মাত্রার কিন্তু তা উৎপাদননির্ভর নয়। স্বাধীনতার পর গত ৪ দশক ধরে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে লুইস তত্ত্বের অবিরাম অনুকরণ প্রকারান্তরে অর্থনীতির সুস্থ বিকাশকেই বিঘি্নত করেছে। উন্নয়নের এই গতিকে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য মোট উন্নয়ন বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় কৃষি ও গ্রামীণ খাতের জন্য নির্ধারণ করা দরকার।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এটা একটা কথার কথা মাত্র। বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দ নির্ধারণের বেলায় তার প্রতিফলন ঘটছে না। ২০১১-১২ সালের বাজেটে কৃষির মূল খাতে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন মিলে বরাদ্দ করা হয়েছে মোট বাজেটের মাত্র ৭.৬৫ শতাংশ অর্থ। এর আগের বছরের তুলনায় দেশের মোট বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ২৫.৮২ ভাগ। কৃষি বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৪.২৩ ভাগ। অর্থাৎ অন্যান্য খাতের তুলনায় কৃষি খাতের বরাদ্দ আনুপাতিক হারে হ্রাস পেয়েছে। শস্য খাতে বাজেট হ্রাস পেয়েছে ১২.১৯ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির বর্তমান হার বিবেচনা করা হলে কৃষিতে প্রকৃত ব্যয় প্রায় সিকি ভাগ কমে গেছে। এর প্রতিকার দরকার।
কৃষি খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন
বর্তমানে কৃষিতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে কৃষি জিডিপিতে শস্য খাতের শরিকানা ছিল ৭৫.৫৪ শতাংশ। প্রাণী, মৎস্য ও বনজসম্পদের শরিকানা ছিল যথাক্রমে ৭.৬৬, ১০.৪৮ এবং ৬.৩৯ শতাংশ। ২০১১-১২ সালে কাঠামোগত পরিবর্তন সাধনের ফলে শস্য খাতের শরিকানা কমে গিয়ে ৫৬.৩১ শতাংশে ঠেকেছে। প্রাণী, মৎস্য ও বনজসম্পদের শরিকানা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১২.৯, ২২.২১ এবং ৮.৫৬ শতাংশে। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ঘটছে এবং অপেক্ষাকৃত অধিক পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের প্রতি তাদের আস্থা বাড়ছে। আমাদের বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন থাকা দরকার। বর্তমানে কৃষির আন্তঃউপখাত বাজেট বণ্টনে কিছু অসঙ্গতি আছে, তা দূর করতে হবে (সারণি-৪)।
২০১০-১১ সালে শস্য খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৪ শতাংশ। মৎস্য ও বনজসম্পদ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৫.৪ ও ৫.৩ শতাংশ। প্রাণিসম্পদ খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.৫ শতাংশ। এর আগের দুই বছরও এ খাতটির অগ্রগতি ছিল মন্থর। ২০১১-১২ সালে মৎস্য ও বনজসম্পদের প্রবৃদ্ধি নূ্যনপক্ষে ৫ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু বিপর্যয় ঘটেছে প্রাণিসম্পদ খাতে। ইতোমধ্যেই পোল্ট্রি শিল্পের উৎপাদন প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। ছয় মাস আগেও ডিমের দাম ছিল প্রতি হালি ২৪ টাকা। এখন তা ৩৪ টাকা। জীবন্ত ব্রয়লার মুরগির কেজিপ্রতি মূল্য ছিল ১১০ টাকা, এখন তা ১৬০ টাকা। এর একটা বিহিত হওয়া উচিত। পোল্ট্রি খামারিদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ঘোষণা করা উচিত। সেই সঙ্গে কৃষি খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের গতিকে ইতিবাচক ধারায় পরিচালনার জন্য উন্নয়ন খাতে আর্থিক সমর্থন প্রয়োজন।
কৃষি ভর্তুকি
কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ধারণ উৎসাহিত করার জন্য প্রদান করা হয় উপকরণ ভর্তুকি। স্বাধীনতার পর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। এরপর তা দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে। গত ৩ বছরে কৃষি ভর্তুকি খাতে মোট ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। বছরে গড়ে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এটা মোট বাজেটের ৪.২৩ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপির ৪.৫৫ শতাংশ। বর্তমানে রাসায়নিক সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম দ্রুত বাড়ছে। বাড়ছে শ্রমিকের মজুরি। তথাপি মোট বাজেট বৃদ্ধির সঙ্গে তুলনা করা হলে কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধির হার কমই মনে হয়। এটা কৃষি জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করা উচিত।
বর্তমানে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও কুইক রেন্টাল খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে ভর্তুকির জন্য। কিন্তু এ নাগাদ ঘন ঘন লোডশেডিং এর কোন সুরাহা হয়েছে বলে মনে হয় না। এ খাতে সাধারণভাবে ভর্তুকি কমিয়ে কেবল কৃষি খাতে ব্যবহারের জন্য ভর্তুকি বাড়ানো হোক, যাতে তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির দায় কৃষকদের ওপর না বর্তায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লাভিত্তিক বৃহৎ প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া উচিত। এ কাজটি শুরু করতে হবে আমাদের নিজস্ব কয়লা উত্তোলন ও ব্যবহারের মাধ্যমে। তাছাড়া সৌরশক্তির ব্যবহার সমপ্রসারণের লক্ষ্যে এ খাতে ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে।
কৃষি বিপণন
কৃষি পণ্যের ন্যায়সঙ্গত মূল্য নিশ্চিত করার জন্য কৃষি বিপণন ব্যবস্থাকে গতিশীল ও যুগোপযোগী করা দরকার। এ লক্ষ্যে কৃষক দল গঠন ও কৃষক ক্লাব সৃজনের কথা বলা হয়েছিল গত বাজেটে। এর অগ্রগতি ও কার্যকারিতা কতটুকু তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কৃষি বিপণন তথ্য বিশ্লেষণ করে উৎপাদক ও ভোক্তাদের কাছে তা দ্রুত পেঁৗছে দেয়ার জন্য এবং আমাদের কৃষি বাজার ব্যবস্থাকে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য এদেশে একটি সংস্থা আছে বহুকাল ধরে। এটির নাম কৃষি বিপণন অধিদফতর। কিন্তু এর কার্যক্রম বড় একটা চোখে পড়ে না। বিগত সরকারের আমলে আমার সভাপতিত্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল সংস্থাটির পুনর্গঠনের লক্ষ্যে। এর একটি প্রতিবেদনও পেশ করা হয়েছিল সরকারের বিবেচনার জন্য। বর্তমান সরকারের আমলেও একই উদ্দেশ্যে অধ্যাপক আবদুস সাত্তার ম-লের সভাপতিত্বে আর একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ কমিটিও একটি প্রতিবেদন পেশ করেছেন। দুটি প্রতিবেদনের মূল সুপারিশ একই ধরনের। সংস্থাটির কার্যক্রম উপজেলা পর্যন্ত সমপ্রসারণ করতে হবে। প্রতিটি পদে কৃষি অর্থনীতিবিদদের অন্তর্ভুক্তি ও নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সংস্থাটিতে নিয়োজিত কৃষি অর্থনীতিবিদদের সংখ্যা হাতেগোনা। দেশের কৃষি বাজারগুলোর মূল্য ব্যবস্থাপনায় এর তেমন কোন প্রভাবও নেই উল্লেখ করার মতো। এভাবে একটি প্রতিষ্ঠান রাখার কোন যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয় না। হয় এটাকে বন্ধ করে দেয়া হোক, নয়তো আমাদের সুপারিশ মতো এটিকে পুনর্গঠিত করে কৃষি বিপণন ক্ষেত্রে সংস্থাটির কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা হোক। সেই সঙ্গে একটি কৃষি মূল্য কমিশন গঠন করা হোক।
কৃষিঋণ
আমাদের কৃষি ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে ভরণ-পোষণ পর্যায়ে। এ খাতে পুঁজির অভাব। উৎপাদনের মৌসুমে কৃষি উপকরণ কেনার মতো প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান থাকে না কৃষকদের। সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণের গুরুত্ব খুবই বেশি। ২০০৯-১০ সালে প্রাতিষ্ঠানিক কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। বিতরণ করা হয়েছে ১১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৬.৬ শতাংশ। ২০১০-১১ সালে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা। যার ৯৬.৬ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। চলতি ২০১১-১২ অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গত মার্চ মাস পর্যন্ত ৬৬.৫৯ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে, বছর শেষে তা ৯৭ শতাংশ অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মোট কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শস্য খাত এবং কৃষিবহির্ভূত গ্রামীণ খাতে সিংহভাগ ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। মৎস্য, পশুসম্পদ, কৃষি সরঞ্জাম এবং কৃষিপণ্য বিপণন ও সংরক্ষণ খাতে ঋণের হিস্যা অপেক্ষাকৃত কম। এসব খাতে কৃষিঋণের পরিমাণ আরও বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে কৃষিপণ্য বিপণন ও সংরক্ষণ কাজে বেশি ঋণ দিয়ে ব্যক্তিপর্যায়ে খাদ্য গুদাম নির্মাণ ও কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। সেই সঙ্গে মসলা ফসলের জন্য ৪ শতাংশ হারে ঋণ প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। তাছাড়া এনজিওদের মাধ্যমে পিকেএসএফ প্রদত্ত কৃষিঋণের পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে। সার্বিক কৃষিঋণের সুদের হার কমিয়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশে নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে কৃষিঋণের সুদের ওপর। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সে, বাজারে ও গ্রোথ সেন্টারে কৃষি ব্যাংকের শাখা খুলতে হবে। তাতে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে বিনিয়োগের জন্য অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। গ্রামের মানুষগুলো ব্যাংকে তাদের আমানত রেখে নিরাপদ বোধ করবে।