সবজি চাষে স্বাবলম্বী সুনামগঞ্জের ভাটির মানুষ

শিল্প-বাণিজ্য ডেস্ক

ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার দরিদ্র ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীরা মাঠে সবজিসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে এখন ব্যস্ত। হাওরের যেসব জমিতে তারা চাষাবাদ করছে এক সময় সেসব জমি পতিত ছিল। গ্রামের শত শত নারী অলস সময় কাটাতেন। ঘরবাড়ির কাজ ছাড়া যেন তাদের কোনো কাজই ছিল না। ফলে স্বামীর একার উপার্জনে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। কিন্তু দৃশ্যপট বদলে গেছে। গ্রামের অনেক নারী ওই জমিতে বিভিন্নমুখী চাষাবাদে কাজে সম্পৃক্ত হয়ে বাড়তি আয় করছেন। এতে তাদের সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে এসেছে। বাসস।
ধাপকাই গ্রামের আছমা জানান, গত ৫ বছর আগে একই জেলার তাহিরপুর উপজেলার কাঞ্চনপুরের বাচ্ছু মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়। প্রথম দিকে স্বামী তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। কিছুদিন পর স্বামী আরেকটি বিয়ে করে এবং তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে গত ২ বছর আগে সামাজিকভাবে বিয়ে ভেঙে যায় এবং তার মা-বাবা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। আছমা বাবার সংসারে থাকলেও পরিবারের বোঝা হতে চাননি। তিনি ২০০৯ সাল থেকে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক এনজিও সংস্থা হেলভেটাস সুইস ইন্টার কো-অপারেশনের সদস্য হয়ে ভিটাবাড়ি ও পতিত জমিতে সবজি চাষ করে সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন। ইতিমধ্যে তার মোটামুটি আয়ও হয়েছে।
৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়া আছমা আরো জানান, তারা ২ ভাই ও ৩ বোন, তিনি চতুর্থ। বাবার ভিটাবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। বর্তমানে আছমা পরিবারের চাহিদা মিটিয়েও ৫টি হাঁস, ১৪টি মুরগি ক্রয় ও ১ কেয়ার বোরো জমি লিজ নিয়েছে।
হেলভেটাস সুইস ইন্টার কো-অপারেশনের ফিল্ড ফেসিলেটর হাজেরা খাতুন (হ্যাপি) জানান, ধাপকাই গ্রামে আছমার মতো এ রকম ৩৪টি পরিবারকে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য দল গঠন করে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ ও ব্রিটিশ সরকার যৌথভাবে। ফিল্ড টিম লিডার মাসুদ রানা জানান, মহিলারা কাজকর্মে খুবই আন্তরিক। তিনি বলেন, তাদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা ফিরে আসছে। 
এক সময় দিরাই বাজারে সবজি আসত সিলেট কিংবা অন্য স্থান থেকে। এখন এলাকার মহিলাদের উৎপাদিত সবজিই স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায়। এমনকি অন্য এলাকায়ও তাদের উৎপাদিত সবজি পাইকাররা নিয়ে যায়। 
হেলভেটাস সুইস ইন্টার কো-অপারেশনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহিদ হাসান বলেন, ‘দুস্থ মহিলাদের কর্মজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে ৬২টি দলকে তারা ২০০৯ সাল থেকে সহযোগিতা করছে। দিরাই-শাল্লা উপজেলার মোট সদস্য পরিবার সংখ্যা ১ হাজার।
গত বছর তারা লাউ, মিষ্টি কুমড়া, শসা, বাঙ্গি, ক্ষিরা, মরিচ, টমেটো, মুলা, ধনিয়া করেছিলেন। এগুলো ছাড়া এ বছর ভুট্টা, আলু, মিষ্টি আলু লাগান। প্রথম বছরের আয় থেকে দলের প্রত্যেক সদস্য পতিত জমিতে সবজি চাষ করে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, বোরো জমিতে আগাম জাতের ধান লাগিয়ে ২ মণ করে ধান, বাড়িতে সবজি চাষে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে পান। 
রফিনগর ইউনিয়নের সেচনী গ্রামের বেগম বিবির ৪ ছেলে, ২ মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। বিয়ের পর দেখেন উভয় পরিবারে একই চিত্র, দারিদ্র্য আর অভাব। স্বামী রোজ শ্রমিক হওয়ায় সংসার ঠিকমতো চলতো না, অভাবের কারণে ছেলে কিছু লেখাপড়া করার পর আর এগোতে পারেনি। তবে মেয়েটি লেখাপড়া করছে। বেগম বিবি জানান, ধাপকাই গ্রামে যখন ২০০৯ সালে ইন্টার কো-অপারেশনের সদস্য বানানো হচ্ছে, আমাকেও তাদের দলে নেওয়া হয়। সেই থেকে তাদের তত্ত্বাবধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছি। এ কাজ করে আমার এবং গ্রামের অনেকের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। গ্রামে ক্রমেই দারিদ্র্য কমে আসছে।
ধাপকাই গ্রামের সাদেক মিয়ার (৪৫) স্ত্রী নাছিমা বেগম। ১৮ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। অভাবের সংসার একে একে কোলজুড়ে আসে ১ ছেলে ও ৪ মেয়ে। নাছিমা বলেন, লেখাপড়া না করায় অন্ধের মতো আছি। সন্তানদের সেই অন্ধকারে রাখতে চাই না। এক সময় সংসারে অভাব থাকায় মাটি কাটার শ্রমিকের কাজ করেছি। এখন আর তা করতে পারি না। অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করেছি, কিন্তু অভাব দূর হয়নি। অবশেষে ২০০৯ সালে হেলভেটাস সুইস ইন্টার কো-অপারেশন আমার মতো ৩৪টি পরিবারকে নিয়ে উদ্দীপনা দল গঠন করে দেয়। তাদের দেওয়া পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে এখন অর্থনৈতিক দিক থেকে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি।
এলাকার অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক মহব্বত আলী জানান, এলাকার স্বামী পরিত্যক্তা ও অভাবী নারীরা বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছে, এটা খুবই আশাব্যঞ্জক।