শেক্সপিয়রের গ্লোব থিয়েটার কাঁপালো বাংলাদেশের `দ্য টেম্পেস্ট’

যখন শিমুল ইউসুফের মোহনীয় কন্ঠে সুরেলা আওয়াজ ছড়িয়ে পড়লো গ্লোব থিয়েটারের পুরো চত্বরে তখন উপস্থিত সহস্রাধিক দর্শক নড়েচড়ে বসলেন।
‘ওই যে দেখা যায়, কি সুন্দর আকাশ’ এটাই বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক শেক্সপিয়রের নিজের কোম্পানির তৈরি গ্লোব থিয়েটারের ৩শ’ পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে প্রথম উচ্চারিত বাংলা শব্দ। যে থিয়েটার সারা পৃথিবীর মঞ্চকর্মীদের জন্য তীর্থস্থান সেই মঞ্চে প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হলো বাংলাদেশের কোনো দলের নাটক।

গ্লোব থিয়েটার সারা পৃথিবী থেকে বাছাই করে নিয়ে এসেছে ৩৭ টি নাটকের দলকে শেক্সপিয়রের নাটক মঞ্চায়ন করার জন্য। ৭ই মে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে ঢাকা থিয়েটার প্রদর্শন করলো শেক্সপিয়রের কালজয়ী নাটক ‘দ্য টেম্পেস্ট’। নাটকটি দেখার জন্য বিরূপ আবহাওয়া ডিঙ্গিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সংস্কৃতিমনা বাঙালি যেমন ছুটে এসেছিলেন তেমনি নজরকাড়া উপস্থিতি ছিলো মূলধারার বৃটিশদের। ১০ ডিগ্রি ছিলো তাপমাত্রা।
খোলা প্রাঙ্গণের থিয়েটারের উম্মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মঞ্চকর্মী জিয়াউর রহিম সাকলায়েন বললেন, তিনি এসেছেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। আরেক মঞ্চকর্মী অভিনেতা রাজু চক্রবর্তী বললেন, “চিন্তায় আছি এই ঠাণ্ডায় কিভাবে নাটক করবেন বাংলাদেশ থেকে আসা অভিনেতারা।“ রাজুর সেই চিন্তাকে মিথ্যা প্রমাণ করে শঙ্খধ্বনিতে প্রকম্পিত গ্লোব থিয়েটারে রাজা প্রসপেরো মায়াজগতে স্বাগত জানালেন। মৃদঙ্গের তুমুল বাদ্য; অ্যারিয়েল রূপী “মঞ্চকুসুম“খ্যাত শিমুল ইউসুফের আহবান দর্শকদের নিয়ে চলে নাটকের গভীরে। নাছোড়বান্দা মেয়ে মিরান্ডার আকুতিতে প্রসপেরো বলে যান কেমন করে সহোদরের চক্রান্তে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয় তাদের। বলেন, প্রকৃতিই বাবা ও মেয়েকে বাঁচিয়েছে; হয়েছেন জাদুতে শক্তিধর। মণিপুরিদের ঢোল বাজানোর কসরতের মাঝেই বেজে ওঠে বিরতির ঘন্টা।

বিরতির সময় জানতে চাইলাম পাশে দাঁড়ানো এক বৃটিশ মঞ্চকর্মী অ্যামির (২১)  প্রতিক্রিয়া। সে এক কথায় বলে উঠলো, ‌ “গ্রেট পারফরমেন্স…গ্রেট ফিলিংস।“ আরেকজন রবার্ট (৩৫) গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এসেছেন লন্ডন থেকে ৪০০ মাইল দূরের ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফ থেকে। তিনি জানালেন, শেক্সপিয়রের নাটককে যে এভাবে ফরম্যাট থেকে ভেঙ্গে নিজস্ব কৃষ্টি কালচার দিয়ে উপস্থাপন করা যায় সেটি দেখে অভিভূত হয়েছেন। সাথে বান্ধবী সারাহ (২৮) বললেন, “অন্তত ব্যাংক হলিডের এই সন্ধ্যাটা ভালোই কাটলো এক আশ্চর্য অনূভূতির মধ্যে দিয়ে।“ একই ধরনের আশ্চর্য ভালো লাগার অনুভূতির মধ্য দিয়ে টেমসের পাড়ে দাঁড়িয়ে বিরতির সময় আড্ডায় মেতেছিলেন ৫ শতাধিক বাঙালি।

এরই মাঝে অন্ধকার হয়ে এলো, মঞ্চে জ্বলে উঠলো  হ্যালোজেন বাতি। ছেলেকে হারিয়ে রাজা এলনসো বিধ্বস্ত; বেঁচে যাওয়া  সাথীও তাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করে। অন্যদিকে ঝড়ের কবলে পড়ে পানিতে ভেসে প্রসপেরোর দ্বীপে আসে অজানা শত্রুর ছেলে ফার্ডিনান্ড । দিন যায়, নানা পরীক্ষার পর; শর্তসাপেক্ষে তাকে দ্বীপে থাকার অনুমতি দেন। ফার্ডিনান্ড ও মিরান্ডা একে অপরের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বেড়ে চলে। শেষ পর্যন্ত ফার্ডিনান্ডের হাতেই আদরের ধন মিরান্ডাকে তুলে দেন প্রসপেরো। সময় গড়ায়, ফিরে পান রাজ্য, ঘাতকরা ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনায় ভোগে।মুক্ত করে দেন কয়েদিদের, মায়বিনী আরিয়েলকে মুক্ত করে দেন চিরতরে। ভৃত্য ক্যালিবান রাজা হয় প্রসপেরোর দ্বীপে। ক্যালিবানের শঙ্খধ্বনিতে আবারও নড়েচড়ে উঠে দর্শক। তুমুল করতালির মাঝে যবনিকাপাত হয় দ্য টেম্পেস্টের।

শিমুল ইউসুফ ছাড়া অন্যান্য কুশীলব কামাল বায়েজিদ, শহীদুজ্জামান সেলিম, খায়রুল ইসলাম পাখি, চন্দন চৌধুরী, এষা চৌধুরী, রুবাইয়াত, সাইমুন, রফিকুল ইসলাম, সাজ্জাদ, রুবল, নীল মনি সিংহ, বিধান চন্দ্র সিংহর পারফরমেন্স ছিলো দেখার মতো।

দর্শকদের তুমুল করতালি আর দূর থেকে ভাসিয়ে দেয়া চুমুতে সিক্ত হন শিল্পীরা, মঞ্চ থেকে শুরু করে দর্শক সারি সবখান থেকেই সুর ওঠে “বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।“ নানা ভাষার উপস্থিত দর্শকও সুর মেলায় বাংলাদেশ… নড়েচড়ে ওঠে শেক্সপিয়রের গ্লোব থিয়েটার…মঞ্চে ওড়ে লাল সবুজের পতাকা। মঞ্চায়নের পুরোটা সময় নির্দেশক নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ছিলেন উম্মুক্ত প্রাঙ্গণে। দাঁড়িয়ে থেকে উপভোগ করেছেন নিজের ক্রিয়েশন। নাটক শেষ হওয়া মাত্রই দর্শকদের অফুরান ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হোন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বলেন, “বাহাত্তর সালে বেইলি রোডের রাস্তায় হেঁটে হেঁটে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে থিয়েটারের শুরু করেছিলাম, আজ এতো বছর পর মনে হচ্ছে কিছু একটা করতে পেরেছি; আমি গর্বিত। এ প্রাপ্তি আমার দলের একার নয়, বাংলাদেশের নাট্যসংশ্লিষ্ট সবাই এর ভাগীদার।“

বিরূপ আবহাওয়া আর ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছাপিয়ে ৭ মে সোমবার বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে জ্বলজ্বল করবে। যেভাবে জ্বলজ্বল করবে গ্লোব থিয়েটারের ইতিহাসেও।