বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও বেশির ভাগ ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা অর্জন

বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও বেশির ভাগ ব্যাংকের রেকর্ড মুনাফা অর্জন
ভবিষ্যতে এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে ॥ গবর্নর
 
আতিকুর রহমান ॥ বছরজুড়ে তারল্য সঙ্কট ও বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পরিচালন মুনাফা অর্জনের ধারা অব্যাহত রেখেছে। বিদায়ী বছরে (২০১১) বেশিরভাগ ব্যাংকই আগের বছরের (২০১০) থেকে বেশি হারে নিট মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে। তবে, চারটি ব্যাংক এ সময়ে লোকসান গুনেছে ৩৪৪ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গত বছর পুরো সময়টাই ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কটের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে মহামন্দা অব্যাহত ছিল। ফলে ঋণ বিতরণে সাময়িক স্থবিরতা সৃষ্টি হলেও ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনের এই প্রবৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিচ্ছে। 
এ সময় ব্যাংকগুলো নিট মুনাফা করেছে নয় হাজার ১২১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মুনাফা করেছে দুই হাজার ২২৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো মুনাফা করেছে প্রায় ১১ কোটি টাকা। আর বেসরকারী ব্যাংকগুলো নিট মুনাফা করেছে পাঁচ হাজার ৬৫৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আর বিদেশী মালিকানাধীন ৯টি ব্যাংক মুনাফা করেছে এক হাজার ২৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। দেশের শীর্ষ ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, এটা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বিরাট ব্যাপার। বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল দিনগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এ সক্ষমতা দেশটির অর্থনীতির স্থিতিশীলতার প্রমাণ বহন করছে। 
জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছে এবং ব্যাংকগুলোর সফলতা ও সক্ষমতার কারণেই বিশ্বমন্দার ছোবল থেকে আমাদের অর্থনীতি রক্ষা পেয়েছে। ব্যাংকগুলো ব্যাপক হারে মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। আশা করছি ভবিষ্যতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। 
গবর্নর বলেন, ব্যাংকগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ব্যাংকিং খাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় কতটা সক্ষম তা নির্ণয়ের জন্য নিরন্তর স্ট্রেস টেস্টের মাধ্যমে ঋণ ঝুঁকি, বাজার ঝুঁকি এবং তারল্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করার বিষয়টি আমরা চালু করেছি। এই প্রবণতা বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনও ছিল না। তাই ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনের ধারা বজায়ে থাকবে।
জানা গেছে, বেশিরভাগ ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা অর্জন করছে। মাত্র চারটি ব্যাংক এ ট্রেন্ড ধরে রাখতে পারেনি। ফলে ব্যাংক ৪টির নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪৪ কোটি ৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী মালিকানাধীন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ২০১০ সালে ১৪ কোটি টাকা নিট মুনাফা করলেও গত বছর ব্যাংকটি লোকসান দিয়েছে ১৪৯ কোটি টাকা। 
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক গত বছর ১২ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। ২০১০ সালে এর পরিমাণ ছিল ২৫ কোটি টাকা। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭৯ কোটি টাকা আগের বছর যা ১৩৬ কোটি টাকা ছিল। বিদেশী ব্যাংক আল-ফালাহ এবারে ২ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। আগের বছর এ ব্যাংকটি লাভ করেছিল ৯ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংক এ সময় লাভ করেছে দুই হাজার ২২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংক গত বছর ৮২২ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে আগের বছর যা ৩৫২ কোটি টাকা ছিল। জনতা ব্যাংক ৬৯১ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ৪৯১ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংক ১৭৮ কোটি টাকা আগের বছর যা ৮৩ কোটি টাকা ছিল। সোনালী ব্যাংক গতবছর ৫৩৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে আগের বছরের তুলনায় যা বেশি।
বেসরকারী খাতের তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো গত বছর নিট মুনাফা করেছে পাঁচ হাজার ৬৫৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছে ৬৩৩ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ৪৪৯ কোটি টাকা। প্রাইম ব্যাংক ৩৭০ কোটি টাকা, আগের বছর যা ৩৪৬ কোটি টাকা ছিল। পূবালী ব্যাংক ৩২৭ কোটি টাকা আগের বছর যা ৩২৩ কোটি টাকা ছিল। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) ৩১৪ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ২১৮ কোটি টাকা। 
সাউথইস্ট ব্যাংক ৩০৩ কোটি টাকা আগের বছর যা ২৭৬ কোটি টাকা ছিল। ইস্টার্ন ব্যাংক ২৫৩ কোটি টাকা আগের বছর যা ২৪২ কোটি টাকা ছিল। ঢাকা ব্যাংক ২১৭ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ১৬৭ কোটি টাকা। আল-আরাফাহ ব্যাংক ২১৬ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ১৮২ কোটি টাকা। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২১৫ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ২০০ কোটি টাকা। 
সিটি ব্যাংক ২১২ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ১৮৭ কোটি টাকা। উত্তরা ব্যাংক ১৬৭ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ১৫৫ কোটি টাকা। যমুনা ব্যাংক ১৪৯ কোটি টাকা আগের বছর যা ১০৭ কোটি টাকা ছিল। মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১৪৯ কোটি টাকা আগের বছর যা ১৪৩ কোটি টাকা ছিল। সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল) ১২৬ কোটি টাকা আগের বছর যা ৬৪ কোটি টাকা ছিল। ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক ৬১ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ৫৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে আগের বছরের তুলনায় যা কিছুটা বেশি।
বিদেশী মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো গত বছর লাভ করেছে এক হাজার ২৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক গত বছর ৬২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে আগের বছর যা ৪৫৩ কোটি টাকা ছিল। এইচএসবিসি ব্যাংক ৪২৮ কোটি টাকা আগের বছর যা ২৬১ কোটি টাকা ছিল। ব্যাংক অব সিলন ৫৯ কোটি টাকা আগের বছর যা ৪৬ কোটি টাকা ছিল। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ৫৮ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ৩৬ কোটি টাকা। হাবিব ব্যাংক ৭ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল সাড়ে ৪ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ৪৩ লাখ টাকা আগের বছর ব্যাংকটির লোকসান হয়েছিল ১৪ কোটি টাকা। উরি ব্যাংক ৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে আগের বছর যা ৪ কোটি টাকা ছিল।
বেসরকারী খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক গত বছর ৫৬৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে আগের বছর ব্যাংকটির মুনাফা হয়েছিল ৬৭৬ কোটি টাকা। এনসিসি ব্যাংক ২১৮ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ২৩৭ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংক ২০৮ কোটি টাকা আগের বছর যা ৩৪৬ কোটি টাকা ছিল। ব্যাংক এশিয়া ১৮৫ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ১৯৩ কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংক ১৬৬ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ২০৭ কোটি টাকা। ওয়ান ব্যাংক ১৪৯ কোটি টাকা আগের বছর যা ১৮৯ কোটি টাকা ছিল। এবি ব্যাংক ১৩৩ কোটি টাকা আগের বছর যা ৩৯৯ কোটি টাকা ছিল। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ১৩০ কোটি টাকা আগের বছর যা ১৩৬ কোটি টাকা ছিল। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ১০৯ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ২০৭ কোটি টাকা। আইএফআইসি ব্যাংক ৮৩ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। ট্রাস্ট ব্যাংক ৬৯ কোটি টাকা আগের বছর যা ১২৯ কোটি টাকা ছিল। প্রিমিয়ার ব্যাংক ৬২ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ১৭৭ কোটি টাকা। মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৪০ কোটি টাকা আগের বছর যা ছিল ৯৮ কোটি টাকা। আর বিদেশী মালিকানার সিটি ব্যাংক এনএ ৫৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে আগের বছর ব্যাংকটির মুনাফা হয়েছিল ১০৬ কোটি টাকা।