এনামুলের আবিষ্কার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়নের ছাত্র এনামুল হক। পরবর্তীকালে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ানপুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এই পর্বে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়াল বা অতি ক্ষুদ্র রাসায়নিক বস্তু। এই বস্তু তৈরিতে এনামুল সফল হন। তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় জার্মানির ‘কেমিস্ট্রি’ নামক জার্নালে। পানি বিশুদ্ধকরণের পরও অনেক ক্ষতিকর পদার্থ থেকে যেতে পারে। যেমন_বিভিন্ন ধরনের জৈব যৌগ, ক্ষতিকর রং কিংবা ফেনল। আর এসব ক্ষতিকর পদার্থ দূর করতে এক ধরনের ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়। এই ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়াল পরিবেশ দূষণ রোধ এবং পানি বিশুদ্ধকরণে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ব্যবহৃত এই ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়ালকেও বিশুদ্ধ হতে হবে। আর সেই চেষ্টাটাই করছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিভাবে অতি অল্প সময়ে বিশুদ্ধ ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়াল পাওয়া সম্ভব, যার মাধ্যমে কম সময়ে পানি বিশুদ্ধ করা যাবে, সেটাই উদ্ভাবন করলেন এনামুল হক। তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতির মাধ্যমে মাত্র এক ঘণ্টায় পানি বিশুদ্ধ করা সম্ভব। এ জন্য কোরিয়া সরকার তাঁকে ‘ব্রেইন অব কোরিয়া’ পদক প্রদান করে। এনামুল হককে নিয়ে আশাবাদী বিশ্বের নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টিগুলো। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারের প্রধান ড. অ্যান্ড্রু হ্যারিস মন্তব্য করেন, ‘মি. হক ইজ এ পিওর গোল্ড’।

পানি বিশুদ্ধকরণে আল্ট্রাসাউন্ড পদ্ধতি
ফ্রান্সের বিজ্ঞানী জি ফেরি ইতিপূর্বে পানি বিশুদ্ধকরণের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। আর তা হলো ক্যালসাইনেশন পদ্ধতি। এক্ষেত্রে বিশুদ্ধকরণের নিমিত্তে পানিকে বৈদ্যুতিকভাবে তাপিত করা হয়। সময় লাগত তিন দিন এবং তাপমাত্রার প্রয়োজন হতো ৩৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এনামুলের উদ্ভাবিত আল্ট্রাসাউন্ড পদ্ধতি সহজ, এক ধাপের, দ্রুত এবং কার্যকর। এ পদ্ধতিতে বিশুদ্ধকরণ করতে সময় লাগে মাত্র এক ঘণ্টা। ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়ালকে প্রথমে এনএন ডাইমিথাইল ফরমাইড দ্রবণে মিশ্রিত করে মাত্র ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করলে সব ধরনের দূষিত পানি মাত্র এক ঘণ্টায় বিশুদ্ধ হয়ে যায়। এর আগে বিশুদ্ধ ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়াল খুব অল্প সময়ের মধ্যে পাওয়া সম্ভব ছিল না।

পানির ক্ষতিকর রং দূরীকরণ পদ্ধতি
এনামুল উদ্ভাবিত পানির সব ক্ষতিকর রং দূরীভূত করার পদ্ধতিটির নাম ‘জিডি-২৩৫’। টেরিথ্যালিক এসিড, ফেরিক ক্লোরাইড হেঙ্াহাইড্রেট এবং ডাই মিথাইল ফরমাইড দিয়ে জিডি-২৩৫ নামে একটি ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা হয়েছে, যা পানির সব ক্ষতিকর রং দূর করতে পারে। আর এতে সময় লাগে মাত্র ২০ মিনিট। এটা একই সঙ্গে পানির ধনাত্মক রং (যেমন_ মিথাইলিন ব্লু) এবং ঋণাত্মক রং (যেমন_মিথাইল অরেঞ্জ) অতি সহজেই দূরীভূত করতে পারে। এ পদ্ধতির গবেষণাপত্র ছাপা হয় নেদারল্যান্ডসের ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস’-এ।

পানির ক্ষতিকর জৈব দূরীভূতকরণ পদ্ধতি
পলিমার বিক্রিয়ায় কার্বন টেট্রা ক্লোরাইড, ইথিলিন ডাই অ্যামিন, এসবিএ-১৫ এবং দ্বিমাত্রিক মেসোপোরাস কার্বন নাইট্রাইড ম্যাটেরিয়ালের মাধ্যমে এনামুল একটি যৌগ তৈরি করেন, যার নাম ‘এমসিএন-১’। এটা পানির ক্ষতিকর জৈব যৌগ, যেমন_ফেনল, বেনজিন ইত্যাদি অতি অল্প সময়ের মধ্যে দূরীভূত করতে পারে। এই ‘এমসিএন-১’ অন্যদের তৈরি পদ্ধতির চেয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণে ফেনল দূর করতে পারে। এটা ছাপা হয় লন্ডনের ‘জার্নাল অব ম্যাটেরিয়াল কেমিস্ট্রি’তে।

চলছে মাল্টি ন্যানো ইলেকট্রনিক
ডিভাইস তৈরির কাজ
এনামুল হক এখন ইউনিভার্সিটি অব সিডনিতে কেমিক্যাল অ্যান্ড বায়ো-মলিকিউলার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ল্যাবরেটরি অব সাস্টেইন্যাবল টেকনোলজিতে গবেষণা করছেন পিএইচডির ছাত্র হিসেবে। বর্তমানে তাঁর গবেষণার বিষয় ‘ন্যানো ডিভাইস ম্যাটেরিয়াল’। এটা অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ড সরকারের যৌথ প্রকল্প। সেখানে এনামুল একটি ন্যানো হাইব্রিড ম্যাটেরিয়াল তৈরির চেষ্টা করছেন। ফুলারিন, ন্যানো পোরাস ম্যাটেরিয়াল, কার্বন ন্যানো টিউবস এবং মেটাল ন্যানো পার্টিকিউলারসের মাধ্যমে নতুন সংযোগ তৈরি করে সম্পূর্ণ নতুন ন্যানো হাইব্রিড ইলেকট্রনিক ম্যাটেরিয়াল তৈরির চেষ্টা করছেন। এই গবেষণা সফল হলে পরিবেশ দূষণ রোধ করা সহজ হয়ে যাবে। জীববিজ্ঞানের সেন্সর, অপটিক্যাল ইলেকট্রনিক যন্ত্র, সুপার প্যারা ম্যাগনেট, কার্বন ডাই-অঙ্াইড দূরীকরণ, পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র এবং মোটরগাড়ির জ্বালানি তৈরিতেও কাজে লাগবে এই গবেষণা। এক কথায়, এটা মাল্টি ন্যানো ইলেকট্রনিক ডিভাইস ম্যাটেরিয়াল।
এনামুল ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে চান, যেখানে দেশের মেধাবী ছাত্ররা খুব সহজেই গবেষণাকাজ চালাতে পারবে। এনামুল চান, গবেষণারত ছাত্রদের সরকার একটা সম্মানী দেবে। এতে ছাত্রছাত্রীরা গবেষণাকাজে উৎসাহ পাবে।