দুপুরের খাবারে খুশি প্রাথমিকের শিশুরা

স্কুল মিলের খিচুড়ি পেয়ে শিক্ষার্থীরা খুশি। বরগুনার বামনা উপজেলার দক্ষিণ সফিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তোলা সাম্প্রতিক ছবি – সমকাল

দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে মাহিন। সকাল ৮টায় ক্লাস শুরু হয় তার। দুপুর ১২টায় ছুটি হওয়ার ঠিক পনেরো মিনিট আগে স্কুল থেকে টিফিন পায় তাদের ক্লাসের সবাই। টিফিনে খিচুড়ি পেয়ে খুশি হয়ে ওঠে মাহিন। ‘মজার খাবার’ খেয়ে ‘ভালোলাগা’ মনে মাঠে খানিকক্ষণ খেলাধুলা করে। এরপর সে চলে যায় বাড়িতে।

এ চিত্র নগরের নয়। দেশের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল বরগুনার বামনা উপজেলার ৪৯ নম্বর দক্ষিণ সফিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক রুটিন এটি। দুপুর আড়াইটায় তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও এখানে গরম খাবার পায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেল, এ উপজেলার সবক’টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই দেওয়া হয় ‘মিড ডে মিল’। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহায়তায় সারাদেশের তিনটি উপজেলায় পাইলট ভিত্তিতে এ কার্যক্রম চলছে। সরকারি তত্ত্বাবধানে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) সুশীলনের ব্যবস্থাপনায় ২০১৩ সালে এ কার্যক্রমের শুরু। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ কার্যক্রম বিস্তৃত হবে ১৬টি উপজেলায়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্নিষ্ট সবার কাছেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে এ কর্মসূচি। তাই জোর তাগিদ আসছে দেশজুড়ে স্কুল মিল প্রকল্প চালুর।

২০০১ সালে যশোর জেলায় অত্যন্ত ছোট পরিসরে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু হয়। ২০১০ সালে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রথমবারের মতো অপেক্ষাকৃত দারিদ্র্যপীড়িত উপজেলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্কুল ফিডিং প্রকল্প নেওয়া হয়। তখন শুধু বিস্কুট দেওয়া হতো। বর্তমানে দেশের ১০৪টি উপজেলার ১৫ হাজার ৮০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি কর্মদিবসে সব শিক্ষার্থীকে ৭৫ গ্রাম উচ্চ পুষ্টিমান সমৃদ্ধ বিস্কুট দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে বরগুনার বামনা, জামালপুরের ইসলামপুর ও বান্দরবানের লামায় শিক্ষার্থীদের রান্না করা গরম খাবার (স্কুল মিল) পরিবেশনের কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, খাবার তৈরির জন্য প্রতিটি স্কুলে স্থাপন করা হয়েছে রান্নাঘর। রয়েছে পরিবেশসম্মত ‘বন্ধু চুলা’। একজন প্রধান রাঁধুনি ও অন্য একজন সহকারী রাঁধুনি রান্না করেন। আশপাশের মানুষের কাছ থেকে খিচুড়ির জন্য প্রয়োজনীয় সবজি সংগ্রহ করা হয়। এতে বিশেষত স্থানীয় দরিদ্র মহিলারা অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ সফিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিয়ারা বেগম সমকালকে বলেন, ‘স্কুলের বেশিরভাগ বাচ্চার মা-বাবাই গরিব। শহরের স্কুলের মতো তারা সন্তানদের দুপুরে টিফিন দিতে পারেন না। স্কুল থেকে বাড়ির দূরত্ব বেশি হওয়ায় বিরতির সময় ছোট শিশুদের বাড়িতে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময়ও থাকে না। ঘরোয়া পরিবেশে রান্না করা খাবার পেয়ে বাচ্চারা অনেক বেশি স্কুলমুখী হয়েছে। তাই সরকারের কাছে সারাদেশেই এ কর্মসূচি চালুর আবেদন করেছেন তিনি।

এই স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম সরোয়ার বলেন, নিঃসন্দেহে এ কর্মসূচি সরকারের যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে প্রতিদিন খিচুড়ি খেতে খেতে শিক্ষার্থীদের অরুচি আসতে পারে। তাই খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনা জরুরি।

বামনা উপজেলা কমপ্লেক্সের সামনে কথা হচ্ছিল মা কুলসুম আক্তারের সঙ্গে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ূয়া সন্তানের বিষয়ে তিনি বলেন, ছেলেটাকে আগে টিফিনের জন্য দুপুরে টাকা দিতেন তিনি। অনেক সময় দিতে পারতেন না। এখন আর সে চাপ নেই। স্কুল থেকেই খাবার দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান চৌধুরী কামরুজ্জামান বলেন, বাচ্চাদের খিচুড়িতে দেওয়া শাক-সবজির একটি তালিকা স্কুলে টানিয়ে দিতে হবে। তাহলে সব উপাদান দিয়ে খাবার রান্না করা হয়েছে কি-না, তা যাচাই করা যাবে। এটা কর্মসূচির স্বচ্ছতার জন্য দরকার- যা মূলত শিশুর কাঙ্ক্ষিত পুষ্টিমান নিশ্চিত করবে।

বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিউলী হরি জানান, তার নিজের উপজেলায় স্থানীয় মানুষজন ও সংশ্নিষ্ট সবার সহযোগিতায় বাচ্চাদের রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। শুধু সরকারের একার পক্ষে সারাদেশে বিশাল এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন। এ জন্য বেসরকারি সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক জোট গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক কে এম এনামুল হক বলেন, সরকার এ বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। যার আলোকে ধাপে ধাপে সারাদেশে স্কুল মিল চালু করা প্রয়োজন। শিশুর উন্নয়নে বিনিয়োগ হচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে বিনিয়োগ। এ জন্য জাতীয় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন।

স্কুল মিল প্রকল্পের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান সারাদেশে স্কুল মিল চালু হোক। এ জন্য জাতীয় স্কুল মিল নীতি-২০১৯-এর খসড়া প্রণীত হয়েছে। এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুমোদন পেলে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু হবে। প্রতিদিনকার খাবারে কিছুটা বৈচিত্র্য আনা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুষম খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানের প্রতি দৃষ্টি রেখে খিচুড়ি তৈরি করা হয়। খিচুড়ির সঙ্গে একদিন ডিম দেওয়া হয়। আরেক দিন পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কুট পায় শিশুরা।