দু’হাতে আবুজারের জীবন জয়

দুই হাতে ভর করে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরেন তিনি। কোন বাড়িতে অশিক্ষিত শিশু আছে, কোন বাড়ির বাবা-মা শিক্ষা সচেতন নয়, কার পড়ালেখা করার মতো সামর্থ নেই এসব খুঁজে বের করা এবং তাদের সচেতন করার কাজ করছেন বিগত ১৫ বছর ধরে।

আর প্রতিবন্ধী হলেতো কথাই নেই। নিজে প্রতিবন্ধী বলে কখনও পিছিয়ে যাননি। অন্য কেউ পিছিয়ে পড়বে তাও দেখতে চান না। এ কারণে প্রত্যন্ত গ্রাম থলপাড়ায় এখন অশিক্ষিত বলে কেউ নেই। শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ সকলেই এখন আলোর পথে।

নিজ এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে নেপথ্য নায়ক প্রতিবন্ধী আবুজার এখন আলোকিত মানুষ। দুই পা না থাকলে মানুষ অচল হয়ে যায় না তা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। প্রতিবন্ধী বলে আগে যারা তাকে অবহেলা করতো, দয়া দেখাতো, তাদের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত প্রত্যন্ত গ্রামের এ স্কুল শিক্ষক।

মাত্র দেড় বছর বয়সে ঘাতক পোলিও যখন ছোট্ট শিশুটির দু’পায়ের শক্তি কেড়ে নিলো, তখন বাবা-মায়ের পাগল হয়ে যাবার অবস্থা। কি হবে ? কীভাবে বাঁচবে অসহায় এ শিশুটি? ভবিষ্যৎই বা কেমনে গড়বে সে। বাবা-মায়ের এ দুঃচিন্তার কারণ ছিল যে শিশুটি, আজ সে পরিণত একজন মানুষ। নিজের অসহায়ত্বকে জয় করে এখন অন্যকে আলোর পথে নিয়ে যাবার পথ-প্রদর্শক তিনি। দু’পায়ে জোর নেই ঠিক, কিন্তু মনের জোর তার ষোলো আনা। কখনও নিজেকে অসহায় ভাবেননি। আর কাউকে অসহায় হতে দিবেন না বলেও প্রতিজ্ঞা করেছেন।

Abuzer-Bogra

আবুজারের বয়স ৩০ বছর। বাড়ি বগুড়ার কাহালু উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের থলপাড়া গ্রামে। বর্তমানে কাহালুর প্রতাপপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত তিনি। পাশের গ্রাম থলপাড়া থেকে ভ্যানে চড়ে স্কুলে আসতে হয তাকে। এরপর হাতে ভর করে শুরু হয় তার জীবন যুদ্ধ। কখনও হাতে ভর করে এ ক্লাস থেকে ওই ক্লাস, আবার কখনও হুইল চেয়ার। স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদের তুলনায় পিছিয়ে পড়তে চাননি তিনি। এ কারণে ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা আবুজার বলতে পাগল। স্যার কখন স্কুলে আসবে, কখন তাদের পড়া বুঝিয়ে দেবে সেই প্রতিক্ষায় থাকে তারা।

স্কুলের ৩য় শ্রেণির ছাত্র মিথুন। ছোট্ট এ শিশুটির ভাষায় ‘স্যার ছাড়া হামরা পড়বার পারিনা। হামাকেরে সব বইয়ের পড়া বুজা দেয় আবু স্যার। হামরা স্যার ককন স্কুলত আসবি সেই জন্যে গেটোত খ্যাড়া হইয়া থাকি।

থলপাড়া গ্রামের ৭৫ বছর বয়সের বৃদ্ধ আবুল মুন্সি জানালেন, হামিও আবু জারের ছাত্র। হামাক লেকা শিকাচে বারে। হামি একুন লিজের নামকোনা লেকপার পারি।

একই গ্রামে প্রতিবন্ধী ফরিদুল ইসলাম বলেন, নিজেকে সব সময় অসহায় মনে হতো। জীবনে কিছু করতে পারবো ভাবিনি। কারণ প্রতিবন্ধী বলে সমাজে অনেক রকমের লাঞ্ছনা বঞ্জনা সইতে হতো। আর এখন আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে আবু স্যার। তার নিজেরও দুই পা নেই। কিন্তু তিনি যেভাবে নিজেকে সমাজের কাছে উপস্থাপন করেন সেটা আমার অনেক ভালো লাগে। আবু স্যার আমার জীবনের ধারাই পাল্টে দিয়েছে। একপা নেই বলে আমি ঘরে বসে থাকিনি।

Abuzer-Bogra

স্কুলে আবুজারের রয়েছে একটি হুইল চেয়ার। তিনি হুইল চেয়ারে বসে প্রতিটি ক্লাসরুমে গিয়ে ক্লাস নেয়াসহ শিক্ষা সংক্রান্ত সকল কাজ কর্ম করে থাকেন। সম্প্রতি একটি ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা কিনেছেন। সেটি নিজেই চালান। কারণ আবুজার প্রতিবন্ধী হলেও কোনোভাবেই সমাজের বোঝা হতে চাননি। তাই নিজের আত্মপ্রত্যয়ের মাধ্যমে সামনের দিকে আরও এগিয়ে যেতে চেয়েছেন।

ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহমান জানান, আবুজার প্রতিবন্ধী হলেও মনোবল রয়েছে অটুট। তার মেধা এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ক্ষেত্রে অন্যান্য শিক্ষকের চাইতে কোনো অংশেই কম নয়। তিনি অবসর সময়ে গল্প, উপন্যাস ও কবিতা লিখে থাকেন। এছাড়া এলাকার গরিব, এতিম প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিনা টাকায় প্রাইভেট পড়িয়ে থাকেন।

স্কুলের সহকর্মী আরও এক শিক্ষক মেহেদী হাসান জানালেন, আমরা যা করি আবুজারও তাই করেন। কখনও প্রতিবন্ধী বলে তিনি কোনো বাড়তি সুবিধা নিতে চাননি।

আবুজারের বাবা মোখলেছুর রহমান জানান, যখন ছেলে প্রতিবন্ধী হলো তার কী হবে ভেবে অস্থির ছিলাম। আজ সেই ছেলেই আমাদের মুখ রক্ষা করছে। শুধু আমরা নয়, গ্রামের মানুষও তাকে নিয়ে গর্ব করে।

Abuzer-Bogra

তিনি জানান, আবুজার দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করার পর বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করে। এরপর ২০১০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় সহকারী শিক্ষক পদে আবেদন করে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পায়। চাকরিতে নিয়োগ পাবার পর তাকে পোস্টিং দেয়া হয় উপজেলার সিংড়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে কিছুদিন চাকরি করার পর তাকে ডেপুটেশনে তার নিজ গ্রামের পাশে প্রতাপপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। চাকরি হবার আগে প্রতিবন্ধী হওয়ার কোনো সরকারি সাহায্য নেননি তিনি।

কথা হয় গ্রামবাসীর সেই মধ্যমনি আবুজারের সঙ্গে। খুব সকালে নিজের অটোরিকশা কিংবা ভ্যানচালক মনির মিয়ার ভ্যানে চড়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্কুলের গেটে এসে নামেন তিনি। তার অপেক্ষায় তখন স্কুলের ছোট ছোট শিশুরা গেটে দাঁড়িয়ে। দূর থেকে ভ্যান দেখেই তারা চিৎকার দিয়ে বলে ওই যে স্যার আসিচ্চে।

আবুজার জানালেন, তার বাবা মোখলেছুর রহমান একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি পার্শ্ববর্তী বামুজা মাদরাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। আর মা জাহানারা বেগম গৃহিণী এবং তার স্ত্রী মোসলিমা খাতুন ডিগ্রি ক্লাসের ছাত্রী। আবুজার ৪ ভাই এক বোনের মধ্যে ৩য়। জন্মের পর পোলিও রোগে তার পা দুটি বিকালঙ্গ হওয়ায় চলাফেরা করেন দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে। কিন্তুু কখনও নিজেকে অসহায় ভাবেন না। আর দশজনের মতোই সমাজে দায়িত্ব পালন করতে চান তিনি। তার ভবিষ্যৎ ইচ্ছা নিজ গ্রামে একটি লাইব্রেরি স্থাপন ও দরিদ্র ফান্ড গঠন করে প্রতিবন্ধীদের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য কাজ করা।