ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি হচ্ছে শিবপুরের লটকন

মাত্র দুই যুগ আগেও লটকনের তেমন কদর ছিল না। পুস্টিকর ও সুস্বাধু হওয়ায় রসালো এই ফলটির দেশে ও বিদেশে চাহিদা বেড়ে যায়। তাই দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে লটকন।

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় এবার লটকনের ভালো ফলন হয়েছে। সঠিক সময়ে লটকন বাগানের ভালো পরিচর্যা করার কারণে এবং সময় মতো বৃস্টি হওয়ায় এবার লটকনের বাম্পার ফলন হয়।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে প্রতিদিন চৈতন্য, কামারটেক, গাবতলী ও রায়পুরা উপজেলার মরজাল বাজারে লটকনের হাঁট বসে। এসব বাজার থেকে শুরু করে ঢাকার কাওরান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকাররা লটকন কিনে নিয়ে যায়।

উপজেলার জয়নগর, যোশর, বাঘাব, চক্রধা এই সব ইউনিয়নের লাল মাটির অসংখ্য ছোট বড় টিলা পাহাড় রয়েছে। লাল মাটি ও ছায়াযুক্ত টিলা পাহাড়ে লটকনের ফলন ভালো হয়। এবার গত বছরের তুলনায় ফলন ভালো হওয়ায় দিগুণ দামে বিক্রি করেছেন বাগান মালিকরা।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১২ শত হেক্টর জমিতে লটকনের বাগান রয়েছে। চারা রোপন করার ৫/৬ বছরের মধ্যে লটকন ফলন আসতে শুরু করে।

এলাকাবাসী জানায়, স্থানীয় পাইকাররা ছোট বড় বাগানে গিয়ে এক মাস আগেই গাছে থাকা কাঁচা লটকন প্রতি মন ১ হাজার থেকে ১৫ শত টাকায় ক্রয় করে থাকেন।

আর এ লটকন আগামী জুলাই মাসের প্রথম দিক থেকে বিক্রি করতে থাকবেন বলে জানান পাইকাররা।

নরসিংদী জেলার ৫টি উপজেলার মধ্যে শিবপুর উপজেলায় লটকনের ফলন বেশী হয়ে থাকে।

জয়নগরের রিয়াজ উদ্দিন বলেন, এক সময় এই পাহাড়ি এলাকায় কাঁঠালের ব্যাপক ফলন হতো। বর্তমানে অনেকে কাঁঠাল বাগান বাদ দিয়ে লটকন বাগান করছে। উপজেলার ৪ টি ইউনিয়নে সকলের বাড়িতেই কম-বেশী লটকনের চাষ করা হয়ে থাকে। লটকন বাগানে খুব বেশী একটা খরচ করতে হয়না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মোঃ মাসুদ মিয়া বলেন, আমি এ বছর ১০ লাখ টাকা দিয়ে ৫টি লটকান বাগান কিনেছি। আগামী জুলাই মাস পর্যন্ত আমার ১ লাখ টাকা খরচ হবে। সকল খরচ বাদ দিয়ে আমার প্রায় ৪ লাখ টাকা আয় হবে।

বটেশ্বর গ্রামের নজরুল মিয়া জানান, চলতি বছর লটকনের বাম্পার ফলন হয়েছে। আশা করছি আমার দুই বিঘা জমির লটকন বিক্রি করতে পারব প্রায় ৫ লাখ টাকা।

সিলেট থেকে আসা মরজাল বাজারে পাইকারি লটকন ব্যাবসায়ী আবু তাহের জানান, চাষীরা এবার লটকনের দাম বেশি হাঁকাচ্ছেন। তবে এবার ফলন ভালো, আকারেও বড় হওয়ায় লটকনের স্বাদও। ক্রেতারা লটকন খেয়ে মজা পাবে। নরসিংদীর লটকনের ক্রেতাদের চাহিদা বেশি তাই আমরা প্রতি বছরই এখান থেকে পাইকারি লটকন কিনে থাকি।

উপজেলার আজকিতলা গ্রামের লটকন চাষি লোকমান হোসেন বলেন, আমি ২৫  বিঘা জমিতে লটকন বাগান করে স্বাবলম্বী হয়েছি। এ মৌসুমেও অন্তত ২০ লক্ষ টাকা আয় হবে বলে আশা করছি।

একই গ্রামের  লটকন চাষি মনির উদ্দিনও ৬ বিঘা জমিতে লটকন চাষ করে অন্তত সাড়ে  তিন লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন। পরবর্তীতে লোকমান হোসেন লটকনের আবাদ করে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার লাভ করে। বর্তমানে আমাদের ১৮ বিঘা জমিতে লটকন বাগান রয়েছে। কাঁচা অবস্থায় গাছে রেখে পাইকারদের নিকট ৩১ লাখ টাকা এই পর্যন্ত বিক্রি করেছি।

লটকন চাষি আয়েছ আলী বলেন, আমি গত ৪/৫ বছর ধরে লটকন চাষ করছি। মাত্র দুই বিঘা জমিতে লটকন চাষ করে ৩ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছি।

কৃষক মোমেন বলেন, আমি পাইকারিভাবে এই মাসেই দেড় লাখ টাকা লটকন বিক্রি করেছি।

নরসিংদীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ লতাফত হোসেন বলেন, লটকনে রোগ বালাইয়ের তেমন  সংক্রমণ না হওয়ায় উৎপাদন খরচ কম ও ফলনও ভালো। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানি হওয়ায় লটকনের ন্যায্য দামও পাওয়া যাচ্ছে। এসব কারণে নরসিংদীতে প্রতিদিনই লটকন চাষের প্রসার ঘটছে।

শিবপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ বিন সাদেক বলেন, এ বছর আবাহাওয়া অনুকূলে থাকায় গত বছরের তুলনায় ফলন অনেক ভালো হয়েছে।