বাংলাদেশের ভাসমান চাষাবাদ নিয়ে ছবি

ফরাসি গবেষক, লেখক ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের তরুণ অভিযাত্রী। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ানক প্রভাবের কথা জানতেন। বিশেষভাবে এক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলো তার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। তবে ২০১২ সালে তিনি জানতে পারেন একটু ভিন্ন বিষয়, মাদাগাস্কারের একদল কৃষক ক্ষয়ে যাওয়া মাটি ও অতি বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় কীভাবে নতুন পদ্ধতিতে ফসল ফলাচ্ছেন। স্থানীয় বা বিদেশী সাহায্যের আশায় না থেকে স্থানীয়রাই পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। আলিজে দুনিয়ায় মানুষের এ নতুন সংগ্রামের চিত্রটি তুলে আনতে নেমে পড়েন। ‘অ্যাডাপ্টেশন’ বা খাপ খাওয়ানো নামে একটি ধারাবাহিক নির্মাণে কাজ শুরু করেন। এর অংশ হিসেবে তিনি প্রথম কাজটি করেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত সমস্যায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। আলিজে বাংলাদেশে এসে গোপালগঞ্জ জেলায় দেখতে পান এক অদ্ভুত দৃশ্য। তিনি দেখেন কৃষকরা কচুরিপানা, বাঁশের সাহায্যে ভাসমান জমি তৈরি করে সেখানে চাষাবাদ করছেন। বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তিনি তৈরি করেছেন ‘অ্যাডাপ্টেশন বাংলাদেশ: সি লেভেল রাইজ’ নামের একটি ছবি, যা এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক ওয়াইল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা শর্ট ফিল্মের পুরস্কার জিতে নিয়েছে।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আলিজে বাংলাদেশে তার কাজ নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারের উল্লেখযোগ্য অংশের ভাষান্তর থাকল এখানে—

জলবায়ু পরিবর্তন বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বিষয়ে কাজ করতে বাংলাদেশকেই কেন বেছে নিলেন?

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। এবং এ ঝুঁকির কারণ অনেকগুলো। শুরুতেই বলতে হয়, এটা একটা বিস্তৃত বদ্বীপ অঞ্চল। বাংলাদেশ গঙ্গা, যমুনা ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। তাই এ দেশ সমতল ও জলমগ্ন। এখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সামান্য বৃদ্ধি বা মৌসুমি জলবায়ুর কিছু পরিবর্তন স্থানীয় মানুষের জীবনে গুরুতর প্রভাব সৃষ্টি করবে, বিশেষত যারা পানির উেসর কাছে বাস করেন। বাংলাদেশ দুনিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। উইসকনসিনের আকারে একটি স্থলভাগে প্রায় ১৬ কোটি মানুষ বাস করে। পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে এ দেশের মানুষের হাতে বিকল্প খুব কম থাকবে।

বাংলাদেশে কীভাবে এলেনআপনার চলচ্চিত্রটি নিয়ে বলুন।

ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল পড়ার সময় আমি বাংলাদেশের ভাসমান বাগানের বিষয়ে জানতে পারি। আমি এ পদ্ধতি দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। আপনি ভাসমান বাগান তৈরি করতে পারেন মানে আপনি প্রকৃতির কাছে বাধ্য নন। পানি যতই বাড়ুক, আপনার খামার অক্ষত থাকবে, সবচেয়ে জলমগ্ন সময়েও আপনি ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। আমি দুনিয়ায় এমনভাবে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের খাপ খাওয়ানোর বিষয়ে আরো খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম এবং এ বিষয়ে একটা ধারাবাহিক তৈরির পরিকল্পনা করি। এভাবেই শুরু করলাম বাংলাদেশ দিয়ে।

বাংলাদেশ নিয়ে আপনার ফিল্মে কী কী বিষয় দেখিয়েছেন?

সাগরে পানির স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের সময়সূচিতে সমস্যাসংক্রান্ত সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশে ব্যবহার করা চার ধরনের অ্যাডাপ্টেশন দেখানো হয়েছে— একেবারে সাধারণ কিছু উদ্ভিদ ব্যবহার করে ভাসমান খামার, রিসাইকেলড বস্তু ব্যবহার করে উন্নত মানের ভাসমান খামার, নৌকায় তৈরি করা ভাসমান স্কুল, গ্রন্থাগার এবং সাগরে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভাসমান খামার, যা দিয়ে একটি শহরের খাবারও সরবরাহ সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করতে বাংলাদেশের কৃষকদের কতটা আশাবাদী বলে মনে হয়েছে?

জবাব দেয়াটা কঠিন। বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই পানির কাছেই বাস করে আসছে। তারা পানির সঙ্গে সমন্বয় করে জীবন ধারণ করে এসেছে। পানি নিয়ে দূর ভবিষ্যত্ করা সম্ভব নয়, কারণ পানি আজ এক অবস্থায় আছে কিন্তু কদিন পরেই একেবারে ভিন্ন চেহারা নিতে পারে।

আপনার ফিল্মের অর্জন কী বলে মনে করেনযারা পানির কাছে বাস করেন নাতারা  ফিল্ম থেকে কী শিখতেপারবেন?

আমি সবসময় বলি যে মানিয়ে নেয়াটা কোনো অনুশীলন নয় বরং এটা একটা মানসিক প্রচেষ্টা। আমার কাছে এ সিরিজ হচ্ছে মানুষের সেই শক্তিকে তুলে ধরা, যার মাধ্যমে সে অন্য সব প্রাণীর চেয়ে এগিয়ে থেকে বহু শতক ধরে টিকে আছে। চিন্তায় মানুষ কতটা স্থিতিস্থাপক ও অভিযোজিত হতে পারে, সেটা এই ফিল্মে দেখা যাবে। আমার প্রায় সব কাজই ইতিবাচক বার্তার কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমরা যারা সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ পরিবেশে বাস করি, তারাই খাপ খাওয়ানো বিষয়ে সবচেয়ে কম সচেতন।

ফিল্মটির পরিবেশনা নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কীকবে তা দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত হবে?

আমাদের পোস্ট প্রডাকশনের কাজ চলছে। সবকিছু আমরা একটা ওয়েবসাইটে দেব। এ প্রকল্প কেবল একটা সিরিজই নয়, এটা একটা শিক্ষামূলক প্রচারণাও। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যেন এ সিরিজ কাজে লাগাতে পারেন, সেজন্য সবকিছু সাজানো হচ্ছে। ওয়েবসাইটে সবাই ফিল্মগুলো দেখতে ও ডাউনলোড করতে পারবেন। আশা করি, এ বছরের শেষ নাগাদ সবকিছু উন্মুক্ত করা হবে।