পুলিশের চ্যালেঞ্জে নারীদের সফলতা

বর্তমানের পুলিশ নারীবান্ধব, কাজ করছেন ১১ হাজার ৭৬৭ জন ** অপরাধ দমন ও নিরাপত্তায় তারাও সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে ** শান্তিরক্ষী মিশনে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই

পুলিশের চ্যালেঞ্জে নারীদের অভাবনীয় সফলতা এসেছে। পুলিশে নারী পুলিশের অভিষেক ঘটে ১৯৭৪ সালে ৮ জন কনস্টেবল যোগদানের মধ্য দিয়ে। তখন নারী পুলিশ সদস্যরা কাজ করতেন সাদা পোশাকে। ইউনিফর্মধারী নারী পুলিশের যাত্রা শুরু হয় দুই বছর পর ১৯৭৬ সালে। ১৪ জন দুঃসাহসী নারীর যোগদানের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীতে কাজ শুরু করা নারী পুলিশ সদস্যদের বর্তমান সংখ্যা ১১ হাজার ৭৬৭ জন। বর্তমানের পুলিশ নারীবান্ধব। অপরাধ দমন ও নিরাপত্তায় তারাও সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে নেই। পুরুষের পাশাপাশি বৈষ্যমহীনভাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে নারী পুলিশ। আর দায়িত্ব পালনকালে সর্বত্রই তারা কুড়িয়েছেন প্রশংসা।

 

পুলিশের নারী সদস্যরা নিজে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি পরিবারেও স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনছেন। নারীদের পুলিশে যোগদান নিয়ে এক সময় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। অনেকেই মনে করতেন নারীরা ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক কিংবা ব্যাংকারসহ অন্যান্য পেশায় যাবেন। তারা কেন পুলিশ অফিসার হবেন? তবে বর্তমানে সেই অবস্থা আর নেই। এখন সর্বত্র নারী পুলিশের প্রশংসা। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর মোট জনবলের ৬ ভাগ নারী। ১৯৮৪ সালে প্রথম ক্যাডারে নিয়োগ পেয়ে ৫ জন নারী পুলিশ কাজে যোগদান করেন। এরমধ্যে ফাতেমা বেগম অতিরিক্ত আইজি হয়ে অবসরে গেছেন। দ্বিতীয় ব্যাচ ১৯৮৫ সালের পর প্রায় ১৪ বছর পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদে নারী পুলিশ অফিসারদের নিয়োগ বন্ধ থাকে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী পুলিশ অফিসারদের নিয়োগ চালু করেন। ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসে ৮ জন নারী সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে পুলিশ ক্যাডারে নারীদের প্রবেশাধিকার আবার উন্মুক্ত হয়। এরপর খুব দ্রুতই বাড়তে থাকে এ সংখ্যা। সংখ্যার সঙ্গে বাড়তে থাকে নারী পুলিশের সুনাম আর সাফল্যও। প্রসারিত হতে থাকে নারী পুলিশের কর্মক্ষেত্রের ব্যাপ্তিও। বর্তমানে কনস্টেবল থেকে ডিআইজি সব পদেই তাদের সরব উপস্থিতি। বর্তমানে দুই জন ডিআইজি রয়েছেন। তারা হলেন মিলি বিশ্বাস ও রৌশনারা। দু’জনই পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত। অতিরিক্ত ডিআইজি ৪ জন ও ৩৭ জন মহিলা এসপি কাজ করছেন। এরমধ্যে ঢাকার বাইরে চাঁদপুরে একজন নারী পুলিশ সুপার দায়িত্ব পালন করছেন। রাজবাড়িতেও দীর্ঘদিন পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালন করেছেন সালমা। তাকে সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছে। তার স্থলে রাজবাড়িতে পুলিশ সুপার হিসেবে নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন আসমা সিদ্দিকা মিলি। এছাড়া পুলিশে যেসব নারীরা কর্মরত তাদের মধ্যে ৯৩ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ১২৬ জন এএসপি, ১০১ জন ইন্সপেক্টর, ৬৪৬ জন এসআই, ৫৫ জন পুলিশ সার্জন রয়েছেন। পুলিশের নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে কাজে স্বচ্ছন্দ্য এসেছে বলে অনেক নারী পুলিশ ইত্তেফাককে জানান।

 

বর্তমানে নারী পুলিশের কাজের ক্ষেত্র যেমন প্রসারিত হয়েছে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ নারী পুলিশ। চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে চলা নারী পুলিশের সফলতা এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও। একটা সময় ছিল যখন নারী পুলিশ মানেই ছিল শুধু দাপ্তরিক কাজে দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু বর্তমানে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। নিরাপত্তার পাশাপাশি টেকসই পুলিশি ব্যবস্থা উন্নয়ন, স্থানীয় তদন্তকারীদের উত্সাহিত করতে সহায়তা, অপরাধ, মানুষর ঝুঁকি প্রশমনের পাশাপাশি শত্রুর মোকাবিলায়ও নারী পুলিশ সদস্যরা এখন দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে নারী সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও আগে ট্রাফিক সার্জেন্ট পদে নারী সদস্যদের কাজ করতে দেখা যায়নি। গত বছর ২৮ জন নারী সার্জেন্ট যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজপথে কাজ করতে শুরু করেন নারী পুলিশ সদস্যরা। থানায় অফিসার ইন চার্জ হিসেবে নারী পুলিশ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। নারী পুলিশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ২০০৮ সালে চালু করা হয়েছে ‘উইমেন পুলিশ নেটওয়ার্ক।’ ২০১২ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে নারী পুলিশের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নারী পুলিশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে।

 

নারী পুলিশ সদস্যরা অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন শান্তিরক্ষা মিশনেও। পুলিশ সদর দপ্তরপ্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যরাও। ১৯৮৫ সালে ইস্ট তৈমুর শান্তি রক্ষী মিশনে যোগ দেন বর্তমান ডিআইজি মিলি বিশ্বাস। পরের বছর সিয়েরালিয়নে শান্তিরক্ষী মিশনে অংশ নেন ফাতেমা বেগম। পরে ২০০০ সালে শান্তি রক্ষা মিশনে প্রথম নেতৃত্ব দেন মিলি বিশ্বাস। মাঝে ১০ বছর বন্ধ থেকে ২০১০ সাল থেকে শান্তি রক্ষা মিশনে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। এ পর্যন্ত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে প্রায় ৮ হাজার পুলিশ সদস্য অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে জাতিসংঘের ৯টি মিশনে প্রায় আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এরমধ্যে বিশ্বের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হাইতি ও কঙ্গোসহ সুদান, দারফুন, আইভরিকোস্ট, লাইবেরিয়া, সোমালিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে জটিল ও অপারেশনাল দায়িত্বও পালন করছেন শান্তি মিশনে অংশ নেওয়া নারী পুলিশ সদস্যরা। বাংলাদেশের নারী পুলিশকে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, বাংলাদেশের নারী পুলিশ সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, যা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এর মধ্য দিয়ে শান্তিরক্ষায় লিঙ্গ সমতা আনতেও বাংলাদেশ পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে। তবে এখনো পর্যাপ্ত নয়।’

 

ডিআইজি মিলি বিশ্বাস বর্তমানের পুলিশকে নারীবান্ধব হিসেবে আখ্যায়িত করে ইত্তেফাককে জানান, পুলিশের কাজ চ্যালেঞ্জিং। এক্ষেত্রে নারীরা সফলতা পরিচয় দিচ্ছেন। তিনি বলেন, পুলিশে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে সুহার্দ্যপুর্ণ সম্পর্ক আছে। এছাড়া একজন নারী তার সমস্যা যেভাবে নারীদের কাছে তুলে ধরতে পারবে, পুরুষদের কাছে সেভাবে তুলে ধরতে পারবে না। এ কারণে কর্মক্ষেত্রে নারী পুলিশ বৃদ্ধি ইতিবাচক। মিলি বিশ্বাস বলেন, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে নারী পুলিশরা কাজ করে যাচ্ছেন। মিলি বিশ্বাস বলেন, পুলিশ বাহিনীতে পুরুষ নারী কোনো ভেদাভেদ আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ নারী সদস্যরা অস্ত্র উদ্ধার করছে, ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী গ্রেফতার করাসহ চ্যালেজিং সব কর্মকান্ডে সমান দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে।

 

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার শামছুন্নাহার ইত্তেফাককে জানান, পুলিশ পেশাটা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জিং। তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নারী সফল। তিনি বলেন, কোন কিছু ঘটার আগে পূর্ব প্রস্তুতি থাকলে মোকাবেলা সহজ হয়। শামছুন্নাহারের স্বপ্ন ছিল প্যারেড কমান্ডার হওয়ার। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে প্রথম মহিলা হিসেবে তিনি প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। এ প্যারেডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্যারেড দেখে মুগ্ধ হন।

 

এআইজি (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস ইত্তেফাককে জানান, সঠিক দিক নির্দেশনা পেলে প্রশাসন চালানো সহজ। তবে মিডিয়ার কাজ ব্যতিক্রম। অন্য পেশার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন তৈরি হওয়ার তিনি আনন্দিত।

 

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেন, বাংলাদেশ পুলিশে নারীরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পুলিশের নারী সহায়তা কেন্দ্রগুলো সঠিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দফতরে নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক র্যালির উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার সব ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষে কাজ করছে। ফলে অন্য পেশার মতো পুলিশেও নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে।