বদলে যাচ্ছে পাট

বদলে যাচ্ছে পাটশিল্প। এটি কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নীতি ও আর্থিক প্রণোদনা শাখা ওই তালিকাভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের অনুরোধ করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মৃত্যুঞ্জয় সাহা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অনুরোধ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামতের আলোকে পাটজাত পণ্যকে কৃষিজাত পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য নীতিগত অনুমোদনের জন্য অর্থ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিবকে অনুরোধ করেন।বিশেষজ্ঞরা জানান, পাটজাত পণ্য কৃষিজাত পণ্যে তালিকাভুক্ত হলে রপ্তানি ভর্তুকি বাড়বে। এর ফলে রপ্তানিতে প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি সুদের হার কমবে। এতে পাটশিল্প উপকৃত হবে। জানা গেছে, পাটকে কৃষিজাত পণ্যে তালিকাভুক্তির দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আটকে আছে।

গত বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পণ্যে পাটজাত মোড়কে বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন ২০১০-এর সফল বাস্তবায়নে সম্মাননা প্রদান এবং বহুমুখী পাটপণ্য মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বলেন, পাট কৃষিজাত পণ্য। অন্য সব পণ্য, যার সঙ্গে কৃষির একটু সম্পর্ক সেগুলোও কৃষিপণ্য হিসেবে বিশেষ সুবিধা পায়, আর পাট পায় না, এটা তো বোঝানো যায় না। আমি ঘোষণা দিতে চাই, পাটপণ্য ও পাটকে কৃষিজাত পণ্য হিসেবেই বিবেচনা করব।এরপরই মূলত পাটকে কৃষিজাত পণ্যে তালিকাভুক্তির আলোচনা শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত পাটপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যকরণ সংক্রান্ত সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আলোকে পাটকে কৃষিপণ্যে তালিকাভুক্তির জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে পাট মন্ত্রণালয়। কৃষি মন্ত্রণালয় জানায় এটি তাদের আওতায় নয়, এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের। পরে অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামত চায়।পাটপণ্যকে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে তালিকাভুক্তির বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তিনটি মতামত জানায়। প্রথম মতামতে বলা হয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদ সহায়তা/রপ্তানি ভর্তুকি এই সার্কুলার জারি করা হয়। বর্তমানে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি খাতে ২০ শতাংশ এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানির বিপরীতে ভর্তুকি সুবিধা রয়েছে।দ্বিতীয় মতামতে বলা হয়, কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানির বিপরীতে ভর্তুকি পরিশোধের সার্কুলার এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানির বিপরীতে ভর্তুকি পরিশোধের সার্কুলার দুটি ভিন্ন। ফলে বিদ্যমান সংযুক্তি তালিকার আওতায় পাটজাত পণ্যে ভর্তুকি পরিশোধের সুযোগ নেই।তৃতীয় মতামতে বলা হয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে নতুন পণ্যকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এবং সে মতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একই সার্কুলার জারি করা হয়। সে বিবেচনায় পাটজাত পণ্যকে কৃষিপণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে (নগদ ভর্তুকিপ্রাপ্তির লক্ষ্যে) অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে।বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামতের আলোকে পাটজাত পণ্যকে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে তালিকাভুক্তির প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণে অনুরোধ করে।বর্তমানে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির বিপরীতে এ খাতের উদ্যোক্তারা সরকার থেকে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা (ভর্তুকি) পাচ্ছেন। কিন্তু পাটদ্রব্য রপ্তানি খাতে ভর্তুকি মিলছে কম। বর্তমানে বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্য রপ্তানির বিপরীতে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা মিললেও পাটজাত চূড়ান্ত দ্রব্য তথা হেসিয়ান, সেকিং ও সিবিসি রপ্তানিতে নগদ সহায়তা মিলছে সাড়ে ৭ শতাংশ। এ ছাড়া পাট সুতা রপ্তানিতে এই সহায়তা মিলছে মাত্র ৫ শতাংশ। কাজেই পাট প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হলে এ খাতের সব পণ্যে উদ্যোক্তারা ২০ শতাংশ নগদ সহায়তার সুবিধা লাভ করবেন।বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তালিকায় ৬৪ ধরনের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রয়েছে। সব ধরনের পাটপণ্য কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলে এ সংখ্যা উন্নীত হবে ৬৫টিতে।বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি এম বারিক খান গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, পাট নিয়ে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলে উপকৃত হবে রপ্তানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী। যে সময়ে পাটকে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলে সংশ্লিষ্ট সেক্টর উপকৃত হবে সেটি যদি সময়মতো করা না হয় তা হলে সুফল পেতে অনেক সময় লেগে যাবে। তিনি বলেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দ্রুত কৃষিপণ্য হিসেবে পাটকে ঘোষণা করা উচিত। রপ্তানি ভর্তুকি বাড়বে, এতে রপ্তানিতে প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি সুদের হার কমবে। এতে পাটশিল্প উপকৃত হবে।বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে তার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ রপ্তানি হয় ভারতে। সর্বশেষ হিসেবে ভারতে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ লাখ টন পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা বর্তমানে অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ১ লাখ টন জুট ইয়ার্ন রপ্তানি হয়েছে। সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৭৪ হাজার টন।