জেলা-উপজেলায় পৌঁছেছে ৭০ শতাংশ বই

আগামী শিক্ষাবর্ষের ৭০ শতাংশ বই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এর মধ্যে প্রাথমিকের অর্ধেকের বেশি বই সরবরাহ হলেও মাধ্যমিকের বই সরবরাহে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শতভাগ বই সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্ত্মক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা।
এনসিটিবির কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিকে ৬৮ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৮টি, প্রাথমিকে ১০ কোটি ৩৬ লাখ ২৪ হাজার ৪০৫টি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক লাখ ৪৯ হাজার ২৭৬টি বই ছাপানো হবে। মোট ১১ কোটি পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার ৩২৯টি বইয়ের মধ্যে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত্ম ছয় কোটি চার লাখ ২৪ হাজার ছয়টি বই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।

দাখিলে তিন কোটি ৫৩ লাখ ২৭ হাজার ৪৮৩টি, হাইস্কুলে ১৮ কোটি ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯২১টি ও ইবতেদায়ির দুই কোটি ৯৭ লাখ এক হাজার ২৪টি বই ছাপার দরপত্র দেয়া হয়েছে। সব মিলে আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২টি বই ছাপা হবে।
মাধ্যমিক স্ত্মরের কিছু এবং ইবতেদায়ির বই ছাপার জন্য ২২০টি লটে আলাদা টেন্ডার দেয়া হয়। এ লটের ১৬ কোটি ৬৭ লাখ বইয়ের মধ্যে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার ১১০টি বই সরবরাহ শেষ। আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে এ লটের সব বই সরবরাহ করার শর্ত রয়েছে। মাধ্যমিক স্ত্মরের বাকি সাড়ে ছয় কোটি বই ৩৪০ লটে টেন্ডার দেয়া হয়েছে। এসব বই ছাপাতে ঠিকাদারদের এনসিটিবি কাগজ কিনে সরবরাহ করে। এ লটের দুই কোটি ৯৭ লাখ আট হাজার ৯৩৩টি বই সরবরাহ শেষ। আগামী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে বাকি বই সরবরাহ করার শর্ত রয়েছে। তবে এ লটের বই সরবরাহে ধীরগতি রয়েছে।
এর কারণ জানতে চাইলে এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী আন্ত্মর্জাতিক দরপত্রে প্রাথমিক স্ত্মরের বই ছাপার টেন্ডার আহ্বান করা হয়। দরপত্রের শর্তানুসারে গত ২৭ অক্টোবরের মধ্যে অর্ধেক বই সরবরাহের নির্দেশ ছিল। এসব ঠিকাদারের অনেকেই মাধ্যমিক স্ত্মরের বিপুলসংখ্যক বই ছাপার কাজ পেয়েছে। ঠিকাদাররা মোটা অঙ্কের জরিমানা এড়াতে মাধ্যমিকের বই ছাপা বন্ধ করে প্রাথমিকের ছেপে সরবরাহ করেছে। এতে মাধ্যমিকের বই ছাপা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।
এনসিটিবিরি সদস্য (পাঠ্যপুস্ত্মক) অধ্যাপক ড. মিয়া ইনামুল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘সুখ পাঠ্য বই’-এর পা-ুলিপি তৈরিতে দেরি হওয়ায় টেন্ডার আহ্বানে বিলম্ব হয়েছে। গত সপ্তাহে এসব বই ছাপার কাজ শুরম্ন হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণ করতে এনসিটিবির কর্মকর্তারা দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। এজন্য ১৮টি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক ছাপার কাজ তদারকি করছেন। তাদের সহযোগিতা করতে মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির একটি উচ্চ পর্যায়ের মনিটরিং টিম কাজ করছে। এবার সব বই বাইন্ডিং হওয়ায় পানিতে ভিজলেও সহজে নষ্ট হবে না।
তবে উৎপাদন নিয়ন্ত্রক শাখার কর্মকর্তারা জানান, মাধ্যমিকের বই সরবরাহে ধীরগতির কারণে এ্যাপেক্স প্রিন্টিং অ্যান্ড কালারস, বাংলাদেশ ডিজিটাল প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, বলাকা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, সরকার প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টার্স, আর আর প্রিন্টিার্স অ্যান্ড প্যাকেজিং, সিমেক্স পেপারস, আবুল প্রিন্টার্স প্রেস, টাঙ্গাইল অফসেট প্রেস, সীমান্ত্ম প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনকে গত ৩০ অক্টোবর কারণ দর্শানো হয়। এছাড়া এনসিটিবির বই ছাপার কাজ বন্ধ করে নোট গাইড ছাপায় বলাকা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, কারণ দর্শানো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছরই সিন্ডেকেট করে বই ছাপার অধিকাংশ কাজ বাগিয়ে নেন। তাদের প্রেসে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বই ছাপানো হয়। ফলে সময়মতো ছাপার কাজ শেষ করতে পারেন না। তাদের কাছে এনসিটিবি কর্মকর্তার অনেকটাই জিম্মি। চলতি বছরও দেরিতে বই দেয়ায় অর্ধশত ঠিকদারকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর পরেও সিন্ডিকেট করে প্রাথমিকের সব কাজ নিয়েছে দেশি প্রতিষ্ঠান। তাদের বিরম্নদ্ধে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপারও অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে এনসিটিবির মনিটরিং টিম তিন প্রতিষ্ঠানের প্রায় দুই লাখ বই নষ্ট করেছে।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল আহমেদ খান বলেন, এনসিটিবি কর্মকর্তারা ভুয়া পরিদর্শনের মাধ্যমে কালো তালিকাভুক্ত ও কিছু অখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছে। তারা নিম্নমানের কাগজে বই ছাপাচ্ছে। এনসিটিবিকে এগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকের দরপত্রে বই সরবরাহের নির্ধারিত সময় বেঁধে দেয়া হলেও মাধ্যমিকের নেই। এ কারণে বই ছাপায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। তবে এখনো সময় আছে। এনসটিবি কর্মকর্তারা আন্ত্মরিক হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহ সম্ভব।
শিক্ষাবিদদের পরামর্শে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নবম-দশম শ্রেণির (স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি) সাধারণ বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান- এ চারটি বিষয়ের ১২টি বইয়ের ভিতরে সব পাতা রঙিন করে ছাপানোর সিদ্ধান্ত্ম নিয়েছে। এ শ্রেণির এক কোটি ৯৭ লাখ দেরিতে টেন্ডার দেয়ায় মঙ্গলবার পর্যন্ত্ম ছাপার কাজ শুরম্ন হয়নি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার বইয়ের পা-ুলিপি তৈরির কাজ শেষ হয়নি। এসব বই ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাত তুলে দেয়া নিয়ে কিছুটা শঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবিরি চেয়ারম্যান নারায়ণ সাহা বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৭০ শতাংশের বেশি পাঠাপুস্ত্মক জেলা উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে মাধ্যমিকের অধিকাংশ বই পৌঁছে গেছে। প্রাথমিকের ৫৫ শতাংশ বই পাঠানো হয়েছে। দ্রম্নত গতিতে ছাপার কাজ চলছে। বাকি বই এ মাসের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এক প্রশ্নের উত্তরে চেয়ারম্যান বলেন, নবম-দশম শ্রেণির সুখ পাঠ্যের বই নিয়ে কিছুটা সংকট সৃষ্টি হলেও তা কাটিয়ে এসব বইয়ের কাজ শুরম্ন হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব বই পৌঁছে দেয়া হবে।