প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়

পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পথশিশু আর ছিন্নমূল মানুষ রাস্তা বা উদ্যান থেকে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করছেন— দেশের সর্বত্র এমন চিত্র কমবেশি সবার চোখে পড়ে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অনেক অঞ্চলে কিছু মানুষের পেশায় পরিণত হয়েছে প্লাস্টিকের বর্জ্য সংগ্রহ। আর ধীরে ধীরে এর ব্যাপ্তি অকেদূর এগিয়েছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য থেকে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা। সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে কেন্দ্র করে দেশে প্রায় ১৫০টি কারখানা গড়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে হাজার হাজার মানুষের।

গত বছর বর্জ্য প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানি করে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশ। নতুন করে অনেক দেশ প্লাস্টিকের বর্জ্য আমদানি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রপ্তানিকারক সংগঠন বাংলাদেশ পেট ফ্লেকস ম্যানুফ্যাকচারাস এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএফএমইএ) মতে, সরকারি সরকারি সহযোগিতা পেলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে এ খাত।

দেশে প্লাস্টিক শিল্পে ৮শ কারখানা এবং ৭৫টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে প্লাস্টিক বর্জ্য বিদেশে রপ্তানি করে আয় হয়েছিল ৪ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা ৪৩ মিলিয়ন ডলার। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩৭ মিলিয়ন ডলার আয় করে দেশ।

বিপিএফএমইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাত থেকে যথাক্রমে ৩৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে বাংলাদেশ। সারাদেশে বোতল কুচি উৎপাদনকারী কারখানার সংখ্যা ৮শর বেশি। ২০০১ সালে সর্বপ্রথম বিভিন্ন ধরনের পেট বোতলের কুচি চীনে রপ্তানি শুরু হয়। ধীরে ধীরে এর প্রসার লাভ করে। ২০১০ সালে ৩০ হাজার টন পিইটি প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানি হয়েছিল। ২০১৩ সালে তা বেড়ে হয় ৪৫ হাজার টন। বর্তমানে প্রতি মাসে সাড়ে ৪ হাজার প্লাস্টিক বর্জ্য চীনে রপ্তানি হচ্ছে।

পেট ফ্লেকস বা বোতল কুচি বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে উন্নতমানের কেমিকেল দিয়ে পরিষ্কার করা হয়। মেশিনে গলানোর পর প্লাস্টিক মণ্ডকে পুনরায় নতুন প্লাস্টিক বোতল তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পেট প্লাস্টিক মণ্ড থেকে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ফাইবার বা তন্তু। যা প্যাড, পুশন, ব্লাংকেট, ভ্যানিশিং ব্ল্যাক ও গাড়ির সিটে ব্যবহৃত মখমল তৈরির কাজে ব্যবহার হয়।

প্লাস্টিকদ্রব্য রপ্তানিকারক সমিতি সূত্রে জানা যায়, বাতিল-সামগ্রী ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট স্থান থেকে এনে রপ্তানি করতে পারলে এ খাতের আয় বছরে ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। চীনের পাশাপাশি নতুন করে ভারত ও ভিয়েতনাম এ ধরনের প্লাস্টিক কিনতে আগ্রহী। তারা ইতোমধ্যে আমদানি শুরু করেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট ফ্লেকস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হাসান ইটিভি অনলাইনকে বলেন, বর্তমানে সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে কেন্দ্র করে দেশে প্রায় ১৫০টি ছোট বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় বিরাট সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, চীন আমাদের প্রধান দেশ যেখানে রিসাইক্লিং করা প্লাস্টিকের ৯০ শতাংশ রফতানি হয়ে থাকে। নতুন করে চীন পণ্য নিতে চাচ্ছে না, আমরা সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করছি। তাছাড়া নতুন করে ভারত এবং ভিয়েতনামে রফতানি হচ্ছে— এটা আশার কথা।

বিপিএফএমইএ’র সেক্রেটারি অনুকুল চন্দ্র রায় ইটিভি অনলাইনকে বলেন, সরকারি সহযোগিতার পরিমাণ বাড়ালে এ খাত হতে পারে রপ্তানির অন্যতম খাত।

তিনি জানান, বর্তমানে এ খাতে রপ্তানির উপর সরকার ১০ শতাংশ হারে ভতুর্কি দেয়। এর পরিমাণ ১৫ বা ২০ শতাংশ করলে আমরা নতুন নতুন দেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে পারব।

অনুকুল চন্দ্র রায় আরো বলেন, সরকার বর্তমানে যে অর্থ দেয় এতে খরচ করে কোনো লাভ থাকে না। ফলে অনেক ফ্যাক্টরি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সম্ভাবনাময় এ খাত টিকিয়ে রাখতে আরও সহযোগিতা দরকার।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জ, বাড্ডা, সাভারসহ সারা দেশে প্রায় ১৫০টি ছোট-বড় কারখানা গড়ে উঠেছে। এ সকল কারখানায় গড়ে প্রায় ৪০ জন করে লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। নতুন করে আরও অনেক উদ্যোক্তা এ খাতে বিনিয়োগ করতে চায়।

বর্জ্য প্লাস্টিকের উৎস : রাজধানীর পথশিশু বা পরিছন্নকর্মীরা প্লাস্টিকের বোতল (বর্জ্য) কুড়িয়ে বিক্রি করে বিভিন্ন ভাঙারির দোকানে। ভাঙারির দোকান থেকে বোতলের লেবেল খুলে রিসাইকেল করা হয়। তারপর এগুলো পরিষ্কার করে তৈরি করা হয় প্লাস্টিক-পণ্য তৈরির কাঁচামাল, যা চীনে রপ্তানি করে আয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। ফেলে দেওয়া বোতল পরিষ্কার করে কারখানার মালিকদের সরবরাহ করেন কেরানীগঞ্জের আব্বাস আলী।

তিনি ইটিভি অনলাইনকে জানান, ভাঙারিরা নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বোতল সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন এখানে। এগুলো তাঁরা ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে কেনেন। পরিষ্কার করা বোতলগুলো তাঁরা কারখানায় পাঠান। তাঁরা কেজিপ্রতি পান ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। সবুজ রঙের বোতলের দাম বেশি বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ভাঙারির দোকান থেকে আসা বোতল থেকে প্রথমে লেবেল খুলে ফেলা হয়, রিসাইকেল করার আগে চলে শেষ পর্যায়ের বাছাই। সাদা, সবুজ, লাল বোতলগুলো আলাদা আলাদা করে রাখা হয়। তারপর এগুলো পরিষ্কার করে তৈরি করা হয় প্লাস্টিক-পণ্য তৈরির কাঁচামাল। যা পরে রপ্তানি হচ্ছে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামে।

এ রপ্তানিপণ্যকে ঘিরে নগরের জুরাইন, কাজলার পাড়, শনির আখড়া, বুড়িগঙ্গার তীরে ও নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে গড়ে উঠেছে কারখানা।

ডিসিসির মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের পাশে গড়ে উঠেছে উচ্ছিষ্ট প্লাস্টিক বোতল থেকে কাঁচামাল তৈরির কারখানা ‘কে এম চৌধুরী রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ’। সেখানে প্রথমে একই রঙের বোতলগুলোর মধ্যে অন্য কোনো রঙের বোতল আছে কি না, তা যাচাই করা হয়। একেক সময় একেক রঙের বোতল দিয়ে কাঁচামাল তৈরি করা হয়। বোতলগুলো ক্রাশার মেশিনে টুকরো (ফ্লেক্স) করা হয়। এরপর মেশিনে সোডা ও ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ফ্লেক্সগুলো ধোয়া হয়। এবার এগুলো একটা সাধারণ পানিভর্তি চৌবাচ্চায় ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে ছাঁকনি দিয়ে তুলে হাইড্রো মেশিনে পানি ঝরানো হয়। হাইড্রো মেশিন থেকে নামিয়ে আনার পর অন্য রঙের দু-একটা ফ্লেক্স থাকলে তা আলাদা করে নেওয়া হয়। শেষে ২৫ কেজি করে ফ্লেক্স প্যাকেট করা হয়।

কে এম চৌধুরী রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজার সুবাস মর্মু জানান, ২৫ কেজির ৫০০ বস্তায় হয় এক কনটেইনার। এক কনটেইনার ফ্লেক্স উৎপাদন করার পর তা চট্টগ্রামে নেওয়া হয়। সেখান থেকে জাহাজে করে ফ্লেক্স যায় বিভিন্ন দেশে।

বিপিএফএমইএ-এর সাবেক সভাপতি সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে যেতে হয়। জাপান ও থাইল্যান্ডে আবর্জনার রিসাইক্লিং দেখে ২০০৩ সালে এমন কারখানা গড়ে তুলি। আমাদের আবর্জনাও ফেলনা নয়, এটাই প্রমাণ করেছি আমরা।’

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. আলী নূর ইটিভি অনলাইনকে জানান, যেহেতু এ শিল্পটি আমাদের পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছে তাই শিল্প রক্ষায় সরকারের ইনসেনটিভ বাড়ানো উচিত। তিনি বলেন, এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর এগিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকগুলোকে ভাবতে হবে, এটা আমাদের একটা সম্ভাবনাময় শিল্প। আজ কাঁচামাল দেশের বাইরে রফতানি হচ্ছে। কিন্তু আমরা সহযোগিতা পেলে দেশেই কাঁচামাল থেকে নতুন পণ্য তৈরি করতে পারব।