ভাঙা ঘরে শিক্ষার আলো

রাস্তার পাশে বাঁশ বাগানের নিচে ছোট্ট একটি ঘর। টিনের চালা, বেড়াও টিনের। কাঠের তৈরি দরজা কিন্তু ভাঙা। দুইটি জানালার একটি বন্ধ। আরেকটা বন্ধ করার উপায় নেই, কারণ সেটা ভাঙা। এ জানালা দিয়েই আলো ঢুকছে ঘরে। সেই আলোই আবার শিক্ষার আলো হয়ে ঢুকছে কোমলমতি শিশুদের হৃদয়ে। বলছিলাম কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়া উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা।
এ স্কুলে কোনো বেঞ্চ নেই। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মাটিতে চট বিছিয়ে বসে পড়ালেখা শিখছে। ৩০ থেকে ৩৫ ছেলেমেয়ে এখানে পড়ালেখা করে। তবে তাদের কোনো বেতন বা ফি দিতে হয় না। শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয় বিনা মূলে। আর এভাবেই ২০০১ সাল থেকে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে এ ভাঙা ঘরটি।
বিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষিকা শারমিন আক্তার মালা জানান, এ স্কুলে বর্তমানে ৩৭ ছাত্রছাত্রী আছে। এর মধ্যে ১৫ ছেলে ও ২২ জন মেয়ে। এরা সবাই হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। ভালো কোনো বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সামর্থ্য নেই কারও। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াও এদের ভাগ্যে নেই। কারণ খাতা-কলম কেনার মতো সামর্থ্য নেই তাদের পরিবারের। তাই আমরা এ স্কুলের ছেলেমেয়েদের বই, খাতা, কলম, পেনসিলসহ যাবতীয় শিক্ষা উপকরণ বিনা মূল্যে বিতরণ করে থাকি। তিনি জানান, গেল বছর এ বিদ্যালয় থেকে ৩০ ছাত্রছাত্রী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৭ জন এবং তিনজন ‘এ’ গ্রেড। এ সাফল্য ধরে রাখার জন্য এবারও কাজ করে যাচ্ছি। আশাকরি, এবার ৩৭ জনই জিপিএ-৫ পাবে। এ বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে উপজেলার ‘বন্ধন সংস্থা’ নামের একটি এনজিও। সংস্থাটির পরিচালক তাহাজ্জেল হোসেন বাদশা জানান, ১৯৯৫ সালে হতদরিদ্র মানুষের কল্যাণের জন্য এ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ব্র্যাকের সহযোগিতায় ২০০১ সালে সংস্থাটি সাতটি উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষা প্রোগ্রাম চালু করে। এ স্কুলে যেসব ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে, তারা সবাই হতদরিদ্র পরিবারের। আমরা এসব ছেলেমেয়েদের শিক্ষা উপকরণ বিনা মূল্যে দিয়ে থাকি। তাছাড়া এখানকার কোনো বাচ্চাকে কোনো রকম ফি দিতে হয় না। তিনি আরও জানান, গেল বছর বন্ধন সংস্থা পরিচালিত সাতটি বিদ্যালয় থেকে মোট ২০১ ছাত্রছাত্রী পিইসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০০ জন এবং ‘এ’ গ্রেড পেয়েছে ১০১ জন। সাতজন ট্যালেন্টপুলে ও ১২ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ করে। এছাড়া এ বছর বন্ধন সংস্থার ৩০টি স্কুল থেকে প্রায় ৯০০ ছাত্রছাত্রী পিইসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে মিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন জানান, বন্ধন সংস্থা পরিচালিত বেশ কয়েকটি স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীরা এবার পিএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের রেজাল্টও ভালো।