লাভজনক রফতানি পণ্য হয়ে উঠছে চলনবিলের শুঁটকি মাছ

পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি সারা দেশে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি বিদেশেও কদর রয়েছে। এতদিন মিঠা পানির মাছের শুঁটকি নিয়ে বাণিজ্যিক ভাবনা তেমন একটা ছিল না। কিন্তু ইদানীং মিঠা পানির বৃহত্ জলাধার চলনবিলের মাছের শুঁটকি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পাড়ি দিচ্ছে। ফলে এ মত্স্যভাণ্ডার ঘিরে গড়ে উঠছে ছোট-বড় প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, লোনা পানির শুঁটকি আর মিঠা পানির শুঁটকির স্বাদ আলাদা। বিদেশীদের কাছে মিঠা পানির মাছের শুঁটকির চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর উপজেলা, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর উপজেলা, নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর ও নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় বিস্তৃত চলনবিলের পানি নামতে শুরু করেছে। জেলেদের জালে ধরা পড়ছে প্রচুর মাছ। টেংরা, পুঁটি, খলসে, বাতাসি, চেলা, মলা, টাকি, বাইম, শোল, গুতুম, বোয়াল, গজার, মাগুর, শিং, কৈসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এ মাছ প্রক্রিয়াজাত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে চলনবিলসংলগ্ন নয়টি উপজেলার তিন শতাধিক শুঁটকি চাতাল। প্রায় ১২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি জলাশয় ও ১৬টি নদীর সমন্বয়ে গঠিত সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর আয়তনের চলনবিলের মাছ যাচ্ছে এসব চাতালে।

শুঁটকি চাতাল মালিক ও শ্রমিকরা জানান, মূলত আশ্বিন-অগ্রহায়ণ পর্যন্ত চলে শুঁটকি উৎপাদন। তিন মণ তাজা মাছ শুকালে এক মণ শুঁটকি পাওয়া যায়। শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ চাতালগুলোয় কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের।

ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, দুবাই ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশে চলনবিলের শুঁটকি যাচ্ছে। শুঁটকি তৈরির পর তিনটি গ্রেডে ভাগ করা হয়। ‘এ’ গ্রেডের শুঁটকি যায় বিদেশে। ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের শুঁটকি বিক্রি হয় দেশের বাজারে। এ বছর এ অঞ্চলে প্রায় ৫০০ টন শুঁটকি তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রংপুরের শুঁটকি ব্যবসায়ী আবু হাসান জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম রংপুর, সৈয়দপুর, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, নীলফামারী, খুলনাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে চলনবিলের শুঁটকি যায়। মানভেদে ছোট আকারের শুঁটকি ১৫-২২ হাজার এবং বড় মাছের শুঁটকি ২৫-৬০ হাজার টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে এ শুঁটকি বিদেশে রফতানি হয়।

জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, দেশ-বিদেশে চাহিদা বাড়ায় প্রতি বছরই মিঠাপানির শুঁটকির উৎপাদন বাড়ছে। পাঁচ বছর আগে শুধু সিরাজগঞ্জে দেড়শ টন শুঁটকি উৎপাদন হতো, সেখানে হয় প্রায় দ্বিগুণ। আর চলনবিল অঞ্চলে শুঁটকি উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৫০০ টন। তিনি বলেন, যথাযথ তদারকি ও পৃষ্ঠপোষকতা দিলে মিঠাপানির শুঁটকি মাছ সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় খাত হয়ে উঠতে পারে। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি অবগত করে চিঠিও দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট গোলাম আবু ইউসুব সূর্য্য বলেন, চলনবিলের মাছ দেশের বাইরেও যাচ্ছে। কারো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে শুঁটকি উৎপাদন ও বাজারজাত করছেন। শুঁটকির উন্নত উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতের বিষয়ে আমরা বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। সম্ভাবনাময় এ খাতটি এগিয়ে নিতে শুঁটকির মান উন্নয়নে চাতাল মালিক ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।