বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে

প্রবাসী আয় প্রেরণে নতুন সেবা নিয়ে মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার

বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরুর ২০ বছর পূর্ণ করেছে বৈশ্বিক পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী কম্পানি মাস্টারকার্ড। ১৯৯৬ সালে দেশের প্রথম ক্রেডিট কার্ড চালু করা এই কম্পানি প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশে নিজস্ব কার্যালয় চালু করেছে। এরপর থেকে দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় নিত্যনতুন সেবা চালু করেছে। সম্প্রতি ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ও বিকাশের সঙ্গে চালু সমন্বিত একটি রেমিট্যান্স সেবা চালু করেছে মাস্টারকার্ড। এর ফলে বিকাশ গ্রাহকরা সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে বিদেশ থেকে স্বজনদের পাঠানো টাকা ২৪ ঘণ্টায় উত্তোলন করতে পারছে। এই সেবা চালুর ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম আরো দ্রুত বিকশিত হবে এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে বলে আশা করছেন মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। চালুর অল্পদিনের মধ্যেই এই সেবায় ব্যাপক সাড়া মিলেছে বলে জানান তিনি। সম্প্রতি কালের কালের কণ্ঠ’র বিজনেস এডিটর মাসুদ রুমীকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে কথা বলেন।

 

মাস্টারকার্ড, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, ব্র্যাক ব্যাংক ও বিকাশ যৌথভাবে প্রবাসী আয় স্থানান্তরের নতুন সেবা চালু করেছে। এই সেবার আওতায় বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কোনো গ্রাহক মাসে ২০টি লেনদেনে সর্বোচ্চ এক লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠানো যাবে। রেমিট্যান্স সেবার এই উদ্ভাবনী সেবা বিশ্বে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে চালু হওয়ায় একে যুগান্তকারী উল্লেখ করে মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘এই পদ্ধতি দেশের রেমিট্যান্স সেবায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে দেবে। এই পদ্ধতিকে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন এবং গ্রাহকবান্ধব করতে আমরা গত দুই বছর ধরে কাজ করেছি। এই সেবার মাধ্যমে আমরা যে পরিমাণ সাড়া পেয়েছি তাতে আগামীতে বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানো বাড়বে।’

বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশ। গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) এক হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠায় প্রবাসীরা। ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে রেমিট্যান্স প্রেরণে অনেকে হুন্ডিকে বেছে নেয়। তাতে বৈদেশিক আয়ের একটি বড় অংশই হিসাবের বাইরে থেকে যায়। সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘আমরা শুধু বৈধ পথের রেমিট্যান্স স্থানান্তরের হিসাবটা জানি। কিন্তু অবৈধ পথে কী পরিমাণ আসছে এর কোনো হিসাব নেই। কেউ কেউ বলে আরো ১৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অবৈধ পথে আসে।’

ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন-মাস্টারকার্ড ও বিকাশের এই উদ্যোগে অনেকেই ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরে আসবে উল্লেখ করে মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার আরো বলেন, ‘এই মাধ্যমে বিদেশ থেকে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের কাছে টাকা পাঠালে তা মুহূর্তের মধ্যে চলে আসবে বিকাশ গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে। গ্রাহক চাইলে সেই টাকা যেকোনো সময় প্রয়োজন মতো উত্তোলন করতে পারবে। পৃথিবীব্যাপী পুশ মডেলটা অনেক আগে থেকেই ছিল। কিন্তু পুল মডেল পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বাংলাদেশে এই মডেলটা আমরা প্রথমবারের মতো চালু করলাম।’

বিশ্বের ১৩৫টি দেশে বাঙালিরা থাকে এবং তারা নিয়মিত টাকা পাঠায়। কিন্তু দেশের সব ব্যাংক ও এনজিও মিলে ১৪ হাজার স্থান থেকে এসব টাকা গ্রহণ করা যেত। এখন বিকাশের এক লাখ স্থান থেকে অর্থ গ্রহণ করা যাবে উল্লেখ করে সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘সনাতনি ব্যবস্থায় টাকা তুলতে এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গ্রাহককে কিছুটা দূরে যেতে হয়। বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা দেশে গ্রহণ করে প্রবাসীদের স্ত্রী কিংবা মা-বাবা, ভাই-বোন। তাদের সংখ্যা ৬০ লাখের মতো। আমরা এখানে লাস্ট মাইলে জোর দিলাম। যে পন্থায় টাকা পাঠাচ্ছে সেভাবেই পাঠাতে পারবে এখনো। এখানে আমরা বিকাশ ওয়ালেটে টাকাটা পুল করার পদ্ধতি যোগ করেছি। এটি একটি নিরাপদ, সহজ এবং সাশ্রয়ী মাধ্যম যেখানে প্রেরকের বাড়তি কোনো খরচ নেই। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের যে খরচ, সেই খরচেই তারা টাকা পাঠাতে পারবে। শুধু দেশে ক্যাশ আউটে ১.৮৫ শতাংশ খরচ হবে। কিন্তু অ্যাকাউন্টে রেখে কোনো বিল, পাওনা পরিশোধ, কেনাকাটা করলে কোনো ক্যাশ আউট চার্জ লাগছে না।’

বাংলাদেশে মাস্টারকার্ডের বাংলাদেশ অফিস চালুর পর গত তিন বছরের অর্জন তুলে ধরে সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘আমরা ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম ক্রেডিট কার্ড চালু করি। এ বছর আমাদের ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ অফিস চালু তিন বছর হচ্ছে। অন্যান্য কার্ডের বাংলাদেশে অফিস নেই। এ দেশে অফিস চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রাহকদের (ব্যাংকগুলোর) কাছে যাওয়া, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নিবিড়ভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কাজ করা। ব্যাংকগুলো তাদের যেকোনো প্রয়োজনে মাস্টারকার্ডকে তাদের পাশে পায়। এ দেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে আমরা অবদান রাখতে পারছি। বাংলাদেশের কার্ড মার্কেট খুব বড় নয়। তবে এটিএম বুথ জালিয়াতিসহ সাম্প্রতিক নানা ঘটনা কার্ড ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে, যেটা প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে।’ সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘কার্ড আমাদের মূল ব্যবসা হলেও আমরা এর বাইরেও নানা ধরনের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি। আমাদের প্রসেসিং নেটওয়ার্ক বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির। বাংলাদেশে ১৬টি ব্যাংকের মাধ্যমে মাস্টারকার্ড ব্যবহূত হচ্ছে, খুব শিগগির আরো কিছু ব্যাংক যোগ হবে। এর বাইরে বেশ কিছু উদ্ভাবনী পণ্য বাংলাদেশে চালু করেছি।’

বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজার খুবই দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বর্তমানে এই খাতে তিন অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বলে জানালেন মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “যদিও বলা হচ্ছে এটি ২০০ কোটি টাকার মার্কেট, যা আরো অনেক বড় হবে। এই বাজারে বেশির ভাগই লেনদেন হয় ক্যাশ অন ডেলিভারির মাধ্যমে। এ ছাড়া কার্ডে ব্যবহার হয় ৩ শতাংশ। আমরা ই-কমার্সের জন্য ইস্টার্ন ব্যাংকের সঙ্গে ই-পেমেন্ট গেটওয়ে চালু করেছি। ‘ইবিএল স্কাইপে’ নামের এই সেবায় আমরা সব মার্চেন্টকে সংযুক্ত করছি। এ ছাড়া আমরা প্রিপেইড কার্ড, বিভিন্ন করপোরেট কার্ড, হজ কার্ড, রবির সঙ্গে আমরা ট্রাভেল এন্টারটেইনমেন্ট কার্ড চালু করেছি। ভবিষ্যতেও পৃথিবীব্যাপী যেসব প্রযুক্তি আসবে আমরা সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে নিয়ে আসব।’

আর্থিক খাতের সাইবার নিরাপত্তা হুমকিতে পড়েছে। সম্প্রতি এটিএম জালিয়াতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে ব্যাংক খাতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় আর্থিক খাতের নিরাপত্তায় দক্ষ জনবল তৈরি, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ বাড়ানোসহ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা অনেক সময় বড় ঘটনা থেকে উত্তরণে সক্ষমতা তৈরি করে দেয়। চিপ কার্ড, টু ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু হলে এমনিতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা যুগোপযোগী হবে। এখনো বেশির ভাগ ব্যাংকই এটি চালু করতে পারেনি। আমার ধারণা, জুনের মধ্যে বড় বড় ব্যাংকে বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। ব্যাংকগুলো এখন প্রযুক্তিগত নিরাপত্তায় প্রচুর বিনিয়োগ করছে।’

কার্ড ব্যবসায় গত প্রান্তিকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে জানিয়ে সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশে পুরো লেনদেনের মাত্র ১ শতাংশ ডিজিটাল পদ্ধতিতে হয়। এ কারণে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। সরকার যেহেতু ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করছে তাই দেশের পুরো লেনদেন পদ্ধতিই আস্তে আস্তে ডিজিটাইজড হবে। তবে ডিজিটাল লেনদেনে মানুষকে যেমন উত্সাহী করতে হবে, তেমনি নিরাপত্তা নিয়েও সচেতনতা বাড়াতে হবে।’