বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে টাকা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে

॥ আমদানিকারকরা স্বস্তিতে ॥ রফতানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় সুবিধাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ ॥ সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স ১৩৫ কোটি ডলার ॥ রিজার্ভ ২৬.৩৮ বিলিয়ন ডলার

আমদানি ব্যয় কমাতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ‘টাকা’ ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ফলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। গত একবছরে রফতানিতে বাংলাদেশের অনেক প্রতিযোগী দেশ মার্কিন ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। এই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান বেড়েছে ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর ডলারের বিপরীতে ভারতের রুপীর অবমূল্যায়ন হয়েছে ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। তবে, টাকা শক্তিশালী হওয়ায় রফতানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমদানিকারকরা এর মাধ্যমে লাভবান হচ্ছেন। রফতানিকারকরা বলছেন, প্রতিযোগী দেশগুলো মুদ্রার অবমূল্যায়ন করায় বাংলাদেশ রফতানিতে সক্ষমতা হারাচ্ছে। কিন্তু আমদানিকারকরা টাকা শক্তিশালী থাকায় কিছুটা হলেও স্বস্তিতে আছেন। তবে রফতানির তুলনায় আমদানি বেশি করায় বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।
জানা গেছে, গত একবছরে রফতানিতে বাংলাদেশের অনেক প্রতিযোগী দেশ মার্কিন ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান বেড়েছে ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর ডলারের বিপরীতে ভারতের রুপীর অবমূল্যায়ন হয়েছে ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সিএনএনমানি সূত্রে জানা গেছে, গত একবছরে চীনা মুদ্রা ইউয়ান ৪ শতাংশ, কানাডিয়ান ডলার ১৭ শতাংশ, ইউরো ১৭ শতাংশ, জাপানী ইয়েন ১৮ শতাংশ, সুইডিশ ক্রোনার ২০ শতাংশ, মেক্সিকান পেসো ২০ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ান ডলার ২১ শতাংশ, নিউজিল্যান্ড ডলার ২২ শতাংশ, তুরস্কের লিরা ২৪ শতাংশ, ব্রাজিলিয়ান রিয়েল ৩৫ শতাংশ, কম্বোডিয়ান পেসো ৩৭ শতাংশ এবং রাশিয়ার রুবলের ৪৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখার কাজ পরোক্ষভাবে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক বছরে ডলারের চাহিদা ধরে রাখতে ৩৫০ কোটি ডলার কিনেছে। এ নিয়ে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ১২৯ কোটি ( ১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন) ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত যেমন বেড়েছে, তেমনি টাকা রয়ে গেছে তেজি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ছিল ২ হাজার ৬৩৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। এর ফলে ডলারের দর এখন ৭৭ টাকা ৮০ পয়সায় ধরে রাখা হয়েছে।
সূত্র মতে, স্থানীয় মুদ্রা শক্তিশালী হলে আমদানিকারকরা লাভবান হন। কারণ আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য কিছুটা কম দামে তাঁরা ডলার কিনতে পারেন। যেমন, এখন যদি ডলার কিনতে হয় প্রায় ৭৮ টাকায়, অবমূল্যায়ন হলে সেটি ৭৯ বা ৮০ টাকা হতে পারে। প্রতিডলার কিনতে তখন আমদানিকারকদের বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি ব্যয় কমানোর দিকেই বেশি আগ্রহী। এমনিতেই বিশ্বব্যাপী প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম কমে গেছে। টাকা শক্তিশালী রেখে আমদানিতে আরও বাড়তি সুবিধা নেয়া হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর লক্ষ্যও এর মাধ্যমে অর্জিত হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের। জানা গেছে, বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে ভারত ও চীন থেকে। আর দেশ দুটিতে রফতানি করে সামান্যই। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি ছিল ৬৫০ কোটি ডলার, রফতানি প্রায় ৫৩ কোটি ডলার। একই সময়ে চীন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ৮২২ কোটি ডলারের পণ্য, রফতানি করেছে মাত্র ৭৯ কোটি ডলারের পণ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এ অবস্থায় আমদানিতেই বেশি লাভবান হচ্ছে বাংলাদেশ। মুদ্রার অবমূল্যায়ন না করে যদি অর্থনীতিতে গতি থাকে তবে দেশের টাকার অবমূল্যায়ন খুব বেশি জরুরী নয় বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন। সারা বিশ্বের অর্থনীতি এখন টালমাটাল অবস্থার সম্মুখীন। এ পরিস্থিতিতে টাকার অবমূল্যায়ন না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করেন বিশিষ্ট ব্যাংকার আনোয়ার ফারুক তালুকদার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রাভিত্তিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১১ সালের জুন মাসের তুলনায় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে সম্পৃক্ত ৯টি মুদ্রার মধ্যে শুধু চায়না ইউয়ানের ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ দর বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে জাপানিজ ইয়েন ৩২ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ভারতীয় রুপী ২৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ, কানাডিয়ান ডলার ১৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, ইউরো ১৪ দশমিক ৪১ শতাংশ, মালয়েশিয়ান রিংগিট ১৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, সিঙ্গাপুর ডলার ৬ দশমিক ২০ শতাংশ, পাউন্ড স্টার্লিং ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং কোরিয়ান ওন ২ দশমিক ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আইএমএফ বলছে, একটি দেশের মুদ্রামানের ১০ শতাংশ অবমূল্যায়ন করা হলে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৫ শতাংশ রফতানি বৃদ্ধি পায়। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ জনকণ্ঠকে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বাজার থেকে ডলার না কিনত, তাহলে প্রতি ডলারের মূল্য ৭২ থেকে ৭৫ টাকায় নেমে আসত।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে মুদ্রার ভাসমান বিনিময় হার চালু থাকলেও ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। বাজার থেকে ডলার কিনে কৃত্রিমভাবে টাকার মূল্য ঠিক রাখা হচ্ছে। ব্যাংকারদের মতে, আমদানি ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য টাকা শক্তিশালী রাখার বিকল্প নেই। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ এবং ব্যবসায়ীরা চান দ্রুত টাকার অবমূল্যায়ন হোক। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে রফতানি ও প্রবাসী-আয়ের প্রদ্ধিতে ওঠানামার কারণে দাবিটি জোরালো হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রফতানির প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশেরও কম। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট রফতানির ৯৯ শতাংশ হয় ডলারের মাধ্যমে। ডলার ও ইউরোর ওঠানামার কারণে বাংলাদেশ গত অর্থবছরে ৩৮ কোটি ডলারের রফতানি হারিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমরা পেরে উঠছি না। আগে মার্কিন ডলারের বিপরীতে আমরা যে পরিমাণ ইউরো পেতাম এখন তার ১৭ শতাংশ কম পাচ্ছি। ইউরোর মূল্যপতন আমাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। তিনি বলেন, একদিকে ডলারের বিপরীতে ইউরোর দাম আমরা কম পাচ্ছি। অপরদিকে ডলারকে বাংলাদেশী টাকায় কনভার্ট করার ক্ষেত্রেও আমরা অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে। তিনি রফতানিকারকদের জন্য ডলারের পৃথক বিনিময় হার চালুর দাবি জানান।

সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স ১৩৫ কোটি ডলার ॥

চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩৪ কোটি ৬২ লাখ ডলার। যা আগস্টের চেয়ে ১৫ কোটি ১২ লাখ ডলার বা সাড়ে ১২ শতাংশ বেশি। আর গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে ২০ লাখ ডলার বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টম্বর এই তিন মাসে প্রবাসীরা দেশে মোট রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ৩৯৩ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ কোটি ডলার কম। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪০১ কোটি ১১ লাখ ডলার।

রিজার্ভ ২৬.৩৮ বিলিয়ন ডলার ॥

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সর্বোচ্চ ২৬.৩৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এক বছরে রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৫৪২.৩৮ মিলিয়ন (৪.৫৪ বিলিয়ন ডলার) ডলার অথবা ১৭.০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, সার্ক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।