তেল রফতানিতে বাংলাদেশ

জ্বালানি তেল রফতানি করবে বাংলাদেশ। প্রথমে পেট্রল ও অকটেন রফতানি হবে। একই সঙ্গে রফতানি করা হবে গ্যাসের উপজাত কনডেনসেটও। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেছে। এরপরই এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তেল রফতানি করে প্রতি বছর এক হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় হবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত ১৫ হাজার টন পেট্রল-অকটেন রফতানির অনুমতি চেয়ে জুলাইয়ের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠায় জ্বালানি বিভাগ। একই মাসের মাঝামাঝিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতি পাওয়ার পর দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি। শুরুতে ১৫ হাজার টন পেট্রল ও অকটেন রফতানির সিদ্ধান্ত হলেও পর্যায়ক্রমে এই পরিমাণ ২ লাখ টনে উন্নীত করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যান এএম বদরুদোজ্জা বলেন, আন্তর্জাতিক দরপত্রে সাড়া দিয়ে শেষদিন দুটি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার জমা দিয়েছে। তাদের দরপত্র মূল্যায়ন করে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ দেয়া হবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে চাহিদা ও পেট্রোবাংলার নির্দেশনা অনুযায়ী পেট্রল ও অকটেন বিক্রির জন্য আরও দরপত্র আহ্বান করা হবে। আপাতত সর্বোচ্চ দুই লাখ টন পেট্রল ও অকটেন রফতানির সক্ষমতা আছে বাংলাদেশের। আমরা সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে চাই।
বিপিসির সূত্র জানায়, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল রফতানির প্রক্রিয়া এবারই প্রথম। তাই অভিজ্ঞতাও কম। আর অল্প সময়ে রফতানি প্রক্রিয়া চালু করায় প্রচার কম হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারেও অপরিশোধিত জ্বালানির দাম পড়তির দিকে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০ ডলারেরও নিচে অপরিশোধিত তেল বিক্রি হয়েছে। এছাড়া এরই মধ্যে ইরান তেলের উৎপাদন বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে- এ বাস্তবতায় হয়তো এখনই ব্যবসায়ীরা এগোতে চাচ্ছে না। এসব কারণেই দরপত্র কম জমা পড়েছে বলে মনে করছে বিপিসি।
জানা গেছে, দেশে মোট ১৪টি রিফাইনারি কেন্দ্র আছে। এর মধ্যে সরকারি চারটি এবং বেসরকারি ১০টি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে উৎপাদিত কনডেনসেটের পূর্ণমাত্রায় ফ্র্যাকশনেশন করতে হলে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ব্যবহার বৃদ্ধি করা খুবই জরুরি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশের গ্যাসক্ষেত্রে ৩ লাখ ২১ হাজার টন কনডেনসেট উৎপাদন হয়েছে। গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টন। আর চলতি অর্থবছরে এর পরিমাণ হবে ৫ লাখ ৬০ হাজার টন। এ কনডেনসেট পরিশোধন করে ৫ লাখ টন পেট্রল ও অকটেন পাওয়া যাবে। আর অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা ৩ লাখ টন। সেক্ষেত্রে ২ লাখ টন পেট্রল ও অকটেন রফতানি করা সম্ভব বলে মনে করছে বিপিসি।
সূত্র জানায়, সরকারের চারটি পরিশোধন কেন্দ্র এসজিএফএল, বিজিএফসিএল, আরপিজিসিএল ও ইআরএল মিলিয়ে তিন লাখ ২৮ হাজার ৬৬৪ টন কনডেনসেট পরিশোধনের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সরকারের এ চারটি প্রতিষ্ঠান এপ্রিল পর্যন্ত ২ লাখ ১১ হাজার ৩৪৫ টন পরিশোধন করছে। অন্যদিকে ১০টি বেসরকারি কোম্পানির ক্ষমতা রয়েছে ৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৪ টন। তবে তারা এপ্রিল পর্যন্ত পরিশোধন করছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৯৫ টন। কিন্তু কনডেনসেট উৎপাদনের সঙ্গে ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টে পরিশোধনের পরিমাণ খুব সামান্য। একই সঙ্গে কনডেনসেট থেকে যে পরিমাণ পেট্রল উৎপাদিত হচ্ছে, সে পরিমাণ চাহিদা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে নেই। এতে গ্যাস উৎপাদনের সঙ্গে উৎপাদিত কনডেনসেট নিয়ে বিপাকে পড়েছে সরকার।
জানা গেছে, এখন দেশে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৪৫০ টন কনডেনসেট উৎপাদিত হয়। তবে এখন দৈনিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টন কনডেনসেট পরিশোধন করছে। বাকিটা পুড়িয়ে ফেলতে হচ্ছে। এতে দৈনিক ৩০ শতাংশ মূল্যবান এ পেট্রোলিয়াম পদার্থ ধ্বংস হচ্ছে। সম্প্রতি দেখা গেছে আশুগঞ্জে কনডেনসেট ট্যাংকারের ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১ হাজার টন। এ পরিমাণ কনডেনসেট এখানে প্রায় সব সময় মজুদ রাখতে হচ্ছে। ফলে বিবিয়ানা থেকে উত্তোলিত কনডেনসেট সেখানে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে কনডেনসেট বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই ক্ষেত্রের দুটি লিকুইড রিকভারি কিছুদিন বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
রিফাইনারি উৎপাদিত তেলের দাম কমিয়ে দেয়ায় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে কনডেনসেটের স্তূপ : ৮ মার্চ দেশী রিফাইনারিগুলোর কাছ থেকে বিপিসির কেনা বিভিন্ন তেলের দাম ৮ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর ঘোষণা দেয় জ্বালানি মন্ত্রণালয়। আগে রিফাইনারিগুলোর কাছ থেকে প্রতি লিটার অকটেন কেনা হতো ৮৮ টাকায়, যা ৫৮ টাকা ২৭ পয়সায় নামিয়ে আনা হয়। একইভাবে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ৮৫ টাকা থেকে ৫৬ টাকা ২৯ পয়সা, কেরোসিন ৬১ থেকে ৫৭ টাকা ৪৪ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ৬০ থেকে ৫৫ টাকা ৯৪ পয়সায় নির্ধারণ করা হয়। নতুন এ দাম গত বছর ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করার কথা। একই সঙ্গে পেট্রোবাংলার অধীনস্থ কোম্পানি ও বিদেশী কোম্পানির দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ করা কনডেনসেটের দরও কমানোর ঘোষণা দেয়া হয়। গেজেট প্রকাশের আগে শোধনাগারগুলো পেট্রোবাংলার কাছ থেকে প্রতি লিটার ভারি কনডেনসেট ৫৮ টাকায় কিনত, যা ৪২ টাকা ৪৭ পয়সায় নামিয়ে আনা হয়। এছাড়া হালকা কনডেনসেটের বিক্রয়মূল্য কমিয়ে লিটারপ্রতি ৫৩ টাকা ৮ পয়সা করা হয়। পরে এ দাম কার্যকরের সময়টিকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যায় পেট্রম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড। কোম্পানিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মার্চ হাইকোর্ট এ দাম কার্যকরের তারিখটি স্থগিত ঘোষণা করেন।
পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে কনডেনসেট : গ্যাসের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কনডেনসেট উঠে আসে। কনডেনসেট দিয়ে পেট্রলসহ অন্য জ্বালানি তৈরি করা হয়। যারা এ কনডেনসেট থেকে জ্বালানি তৈরি করে তারা নিচ্ছে না বলেই সমস্যা তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, সরকার অকটেন ও পেট্রলের দাম কমিয়ে দেয়ার কারণে বেসরকারি রিফাইনারিগুলো কনডেনসেট নেয়ার বিষয়ে কম আগ্রহ দেখাচ্ছে।
তবে জ্বালানি সচিব আবু বকর সিদ্দিক বলেন, সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। খুব শিগগিরই বেসরকারি কোম্পানিগুলো কনডেনসেট নিতে শুরু করবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই দাম নির্ধারণ করা হয়। ফলে দামের কারণে এ সমস্যা হয়নি। রফতানি শুরু হলে কনডেনসেটের চাহিদা বাড়বে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে রফতানির অনুমতি চেয়ে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে দেশে কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশনের পরিমাণ বাড়ছে এবং গ্যাস ফিল্ডের কনডেনসেট উৎপাদন বাড়ছে। কিন্তু ওই হিসেবে দেশে পেট্রল ও অকটেনের চাহিদা বাড়েনি। এ অবস্থায় পেট্রোবাংলার তরফ থেকে জ্বালানি বিভাগকে জানানো হয়েছে উদ্বৃত্ত পেট্রল, অকটেন এবং কনডেনসেট রফতানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। সারসংক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীকে আরও জানানো হয়, দেশে উৎপাদিত কনডেনসেট জি-টু-জি (সরকার-টু-সরকার) মাধ্যমে অথবা দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিদেশে রফতানির করা যেতে পারে।
এতে আরও বলা হয়, গ্যাসের সহজাত কনডেনসেট পরিশোধন করে পেট্রল, অকেটন ও জেট ফুয়েল, সামান্য ডিজেল এবং কেরোসিন তৈরি হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে বিপুল পরিমাণ পেট্রল, অকেটন ও জেট ফুয়েল ব্যবহারের সুযোগ নেই। যদিও ডিজেল এবং কেরোসিনের দেশে চাহিদা রয়েছে। সঙ্গত কারণে পেট্রল, অকটেন ও কনডেনসেট রফতানির সুযোগ রয়েছে। অপরদিকে গ্যাসের উৎপাদন ঠিক রাখতে হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এরপরই প্রধানমন্ত্রী তা অনুমোদন দেন।